প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন মাস্তানি

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন মাস্তানি

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের আকাশে গত শনিবার ভোরে বিস্ফোরণ এবং ধোঁয়ার কালে ইতিহাসের এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভূতপূর্ব সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী এটি ছিল ‘বড় পরিসরে’ এবং ‘সফল’ অভিযান, যা মূলত মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা এবং ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। স্ত্রীসহ মাদুরোকে আটকের পর অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কারাকাস এই হামলাকে আগ্রাসন আখ্যা দিয়ে বলেছে, মাদুরোই এখনও তাদের বৈধ প্রেসিডেন্ট। রাশিয়া এই হামলার নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সবকিছু স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে।

অভিযানের শুরু, মধ্যরাতে কারাকাসে বিস্ফোরণ : ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস কেঁপে ওঠে একের পর এক বিস্ফোরণে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর একাধিক সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান ও হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ করা হয়।

প্রধান দুটি লক্ষ্য ছিল: লা কারলোটা সামরিক বিমান ঘাঁটি এবং ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক কমপ্লেক্স, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট মাদুরো অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

‘বড় পরিসরের হামলা’র ঘোষণা ট্রাম্পের : হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ‘বড় পরিসরের সামরিক অভিযান’ চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ছিল একটি চমৎকার অভিযান। দক্ষ ও দুর্দান্ত সব মানুষ এতে যুক্ত ছিলেন।’ সবশেষ খবর অনুযায়ী মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়েছে।

ডেল্টা ফোর্সের ভূমিকা : মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস ও সিএনএনের বরাতে জানা যায়, অভিযানে নেতৃত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে একটি সুরক্ষিত দুর্গ থেকে হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়া হয়। অভিযানের সময় কয়েকজন আহত হলেও কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি বলে জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

মাদুরো দম্পতিকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘোষণা : ট্রাম্প জানান, মাদুরো ও তার স্ত্রী বর্তমানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায় আছেন এবং তাদের নিউইয়র্কে নেওয়া হচ্ছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘হেলিকপ্টারে করে তাদের জাহাজে আনা হয়েছে। খুব সুন্দর একটি ফ্লাইট ছিল, আমি নিশ্চিত তারা উপভোগ করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, তারা অনেক মানুষ হত্যা করেছেন।’

মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা : ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোকেন আমদানি, মাদক-সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে তার গ্রেফতারে সহায়ক তথ্যের জন্য পুরস্কারের পরিমাণ বাড়িয়ে পাঁচ কোটি ডলার করা হয়। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বোন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাস, ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিচার চলবে।

ভেনেজুয়েলার সরকারের প্রতিক্রিয়া : ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘নিকোলাস মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট। তাকে তুলে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘সামরিক আগ্রাসন’ আখ্যা দেয় এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া : ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভলাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই বিদেশি সেনা সহ্য করব না। ঐক্যবদ্ধভাবে এই হামলা প্রতিরোধ করা হবে।’ অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সরকারের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে বলেন।

Manual1 Ad Code

কে চালাবেন ভেনেজুয়েলা : মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা কার হাতে যাবে; তা স্পষ্ট নয়। সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা ‘চরম অনিশ্চিত’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

Manual3 Ad Code

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল দাবি করছেন, মাদুরোই এখনও প্রেসিডেন্ট, বাস্তবে তার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন; তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও ঘনীভূত করতে পারে এবং বিরোধী দলগুলোর সক্রিয়তা বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দ্রুত পরিস্থিতি স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন।’ এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানান, এই অভিযানে যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিল না।

ট্রাম্পের অবস্থান : ট্রাম্প দাবি করেন, এক সপ্তাহ আগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মাদুরোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ‘আমি বলেছিলাম, আপনাকে হার মানতে হবে। আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ : হামলার সময় রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্কিত মানুষজনকে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। আবাসিক এলাকায় আগুন, ধোঁয়া এবং বিধ্বস্ত গাড়ির ছবি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন : সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দিন আগেই মাদুরোকে আটক করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। এই অভিযানের আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) কয়েক মাস ধরে মাদুরোর অবস্থান ট্র্যাক করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে চলমান মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়।

অবশ্য এই সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কোনো পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না; তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। রিপাবলিকান দলের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সিনেটর মাইক লি প্রথমে এই অভিযানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনালাপের পর

তিনি জানান, এই অভিযান মূলত একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছে।
সিনেটর লির ভাষায়, প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে, যেখানে আসন্ন হুমকি থেকে মার্কিন নাগরিক ও কর্মীদের সুরক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

‘মাদক-সন্ত্রাসের কেন্দ্র’ ভেনেজুয়েলা : যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, নিকোলা মাদুরোর সরকার আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসন কার্টেল দে লস সোলেস নামের একটি গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং দাবি করেছে, মাদুরো ওই গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বোন্ডি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাস, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

Manual5 Ad Code

ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ চিত্র : হামলার পর ভেনেজুয়েলার রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের ঘরে থাকার আহ্বান জানায়।
সরকারি সূত্রে হতাহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো না হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বেসামরিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং অনেক পরিবার রাতেই এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে গেছে।

বিরোধী দল ও নির্বাসিত নেতৃত্ব : ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর দাবি, প্রকৃত বৈধ প্রেসিডেন্ট হলেন নির্বাসিত রাজনীতিক এডমুন্ডো গঞ্জালেস। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পর এই দাবি নতুন করে জোরালো হচ্ছে। তবে বিরোধী দলগুলো এখনও প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি, ফলে দেশটি এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যেই রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি দেশ সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করা নজিরবিহীন ঘটনা। রাশিয়া একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বললেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বেশিরভাগই এখনও আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। এই নীরবতা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

তেল ও ভূরাজনীতি : ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে ‘অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে’ যুক্ত হবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক অভিযানের পেছনে কেবল আইনগত বিষয় নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও বড় ভূমিকা রেখেছে।

‘টেলিভিশনের মতো’ অভিযান : ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, অভিযানের দৃশ্য যেন টেলিভিশনে কোনো শো দেখার মতো ছিল। এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

Manual2 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code