ইসির গুরুত্ব সংসদ নির্বাচনে, সরকারের মনোযোগ গণভোটে
ইসির গুরুত্ব সংসদ নির্বাচনে, সরকারের মনোযোগ গণভোটে
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৯:১৩ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি ভোটাররা রায় দেবেন রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে। কিন্তু মাঠের প্রচার কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই দুই ভোটের প্রচারে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মনোযোগের জায়গা এক নয়, বরং স্পষ্টত বিভাজিত।
এদিকে তফসিল ঘোষণার পর ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সাধারণ ভোটারের গণভোট সম্পর্কে এখনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তাদের অনেকেই সংসদ ভোটে আগ্রহী, তবে ৩০টি বিষয়ের সমন্বয়ে তৈরি চারটি প্রশ্নের ‘হ্যাঁ/না’ ভোটকে জটিল মনে করছেন এবং পর্যাপ্ত প্রচার না থাকার অভিযোগ তুলছেন। এমন বাস্তবতায় সংসদ নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে গণভোটের জন্য পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন, ৮০ লাখ লিফলেট ও ৫৭ হাজার ব্যানার বিতরণে সীমাবদ্ধ রেখেছে ইসি। অন্যদিকে সরকার ভোটার গাড়ি, ভিডিও চিত্র, বিলবোর্ড, ব্যানার, লিফলেটসহ বহুমাত্রিক প্রচারে বেশি মনোযোগী হলেও তাদের প্রচারে গৌণ হয়ে পড়েছে সংসদ ভোট। ইসি বলছে, গণভোটের সার্বিক প্রচারের দায়িত্ব সরকারের; আর সরকার বলছে, এই গণভোটই দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নির্ধারণ করবে।
ইসি যেখানে মূলত সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে সরকার তুলনামূলকভাবে গণভোটকে সামনে রেখে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারে নেমেছে। এই ভিন্নমুখী মনোযোগই তৈরি করেছে প্রশ্ন, ভোটাররা কি আদৌ গণভোটের বিষয়টি বুঝে ভোট দিতে প্রস্তুত?
গণভোট নিয়ে ভোটারদের অভিমত
প্রথমবারের মতো এবার এক দিনে দুই ভোট আয়োজনে ভোটারদের মধ্যে সংসদ নির্বাচন নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকলেও গণভোট নিয়ে এখনো অনেক ভোটারই দ্বিধায় রয়েছেন। ধানমন্ডির শংকর এলাকার বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৫৫)। গণভোট সম্পর্কে কী জানেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি সংসদ নির্বাচন বুঝি, গণভোট তো বুঝি না! তবে আমি শুনছি, এবার ভোটের দিন একসঙ্গে গণভোটও দিতে হবে। লোকমুখে শুনেছি রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয় নিয়ে নাকি এই ভোট। কিন্তু এই ভোট দিলে আমাদের কী হবে কিছু জানি না। এখন পর্যন্ত কাউকে এদিকে এ বিষয়ে প্রচার করতে দেখিনি। জানতে পারলে ভালো হতো।’
গণভোট সম্পর্কে লালমাটিয়া এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী তাছলিমা আক্তার (৩৮) বলেন, ‘গণভোটের কথা আমি টিভিতে দেখে জেনেছি। তবে ভালোভাবে বুঝিনি। তবে মনে হয়েছে এটা রাষ্ট্রের স্বার্থে দরকার। গণভোটকে আমি ইতিবাচক মনে করছি। তবে বুঝে ভোট দেওয়া না গেলে গণভোটের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে খুব সহজ ভাষায় গণভোট সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালানো।’
বাংলামোটর এলাকায় বেসরকারি এক চাকরিজীবী ফাহিম আহমেদের সঙ্গে কথা হলে জানতে চাই গণভোট নিয়ে তার ভাবনা। তিনি বলেন, ‘৩০টি বিষয়ের সমন্বিত প্রশ্নে এবার যে গণভোট, তা আমার কাছে জটিল মনে হচ্ছে। কারণ সব প্রশ্নে আমি একমত নই। ভোট দেব, কিন্তু গণভোটে কী করব, এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।’
Manual4 Ad Code
ইসির গণভোট প্রস্তুতি ও প্রচার কার্যক্রম
নির্বাচন কমিশন এবার ভোটারদের জন্য দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট রাখছে, সাদা ব্যালট সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের ‘হ্যাঁ/না’ রায় দেওয়ার জন্য। দুটি ব্যালটে যেহতেু ভোট দেওয়া হবে, সে কারণে ভোটের সময় ও বুথ সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে একটানা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
Manual8 Ad Code
এ বিষয়ে ইসি কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘জাতীয় সংসদের ভোট মানেই একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট। সবকিছু একা ইসির পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই গণভোটের সার্বিক প্রচারের দায়িত্ব সরকারের নির্বাহী বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রপ্রতি গণভোটের প্রশ্নসংবলিত হ্যাঁ/না ব্যানার টানানো হচ্ছে। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।’ ইসি সূত্র জানায়, গণভোট সচেতনতায় ৮০ লাখের বেশি লিফলেট এবং ৫৭ হাজার ব্যানার ছাপিয়ে বিতরণ করা হচ্ছে।
সরকার সংসদ নির্বাচনের চেয়ে গণভোটে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে–এমন প্রশ্নে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘সংসদ ভোট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু গণভোট কী এবং কেন, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। সে কারণেই সরকার গণভোটে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
গণভোটের প্রশ্নগুলো অনেক ভোটারের কাছে জটিল, সমাধানের উপায় কী? এ প্রশ্নের জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘প্রশ্ন জটিল মনে হলেও বিষয়টা তা নয়। আসলে জুলাই সনদ কার্যকর হোক–এ বিষয়টি যারা ধারণ করবে, তাদের এসব বিষয় বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
গণভোট সচেতনতায় সরকারের প্রচার কার্যক্রম
Manual8 Ad Code
গণভোট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারি প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে, ‘ভোটার গাড়ি’ নামে মোবাইল ক্যাম্পেইন, ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল বিলবোর্ড, ব্যানার ও লিফলেট এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মশালা। সরকারি পর্যায়ে এই গণভোট প্রচার কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট ক্যাম্পেইনের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত নির্বাচনি কর্মশালায় গণভোট বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমেই আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, শেখ হাসিনার মতো আরেকটা ফ্যাসিস্ট তৈরি হবে কি না, তা জনগণ ঠিক করে দেবে। গণভোট কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাচন নয়। এখানে কোনো প্রার্থী নেই। এটি এমন একটি নির্বাচন, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ পরিচালনার পথ ও পদ্ধতি জনগণ নির্ধারণ করে দেবে।’
ড. আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচ বছরের জন্য সরকার ঠিক করা হয়। কিন্তু গণভোট সেই রকম নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। তাই জনগণের সামনে একটি অনন্য সুযোগ এসেছে।’
গণভোটের বিষয়বস্তু: কী নিয়ে ভোট?
Manual7 Ad Code
গণভোটে ভোটারদের সামনে একটি সম্মিলিত প্রশ্ন রাখা হচ্ছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও এর সঙ্গে সংযুক্ত সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাবগুলো কি আপনি মেনে নিচ্ছেন?’ এর আওতায় রয়েছে চারটি বড় বিষয়–তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, ৩০টি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধনী। এই প্রশ্নগুলোর জটিলতাই ভোটারদের বিভ্রান্তির বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে দুই ভোটের প্রচারে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় ইসি এবং সরকার–দুই পক্ষের দুদিকে অগ্রাধিকার দেখা যাচ্ছে, ইসি সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগী। সরকার গণভোটকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারে ব্যস্ত। এই বৈপরীত্যের মাঝেই ভোটারদের বড় অংশ এখনো গণভোট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন। একই দিনে দুটি ভিন্ন মাত্রার ভোট–একটি পরিচিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অন্যটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের সিদ্ধান্ত। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারকে বোঝানো।