প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

জুলাই-আগস্ট: ১০৫ মরদেহের দাবিদারই নেই!

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ
জুলাই-আগস্ট: ১০৫ মরদেহের দাবিদারই নেই!

Manual1 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রায়েরবাজার কবরস্থানে ‘অজ্ঞাতপরিচয়ে’ দাফন করা হয়েছিল ১১৪টি মরদেহ। এই কবরগুলোর নামের জায়গায় লেখা ছিল শুধু একটি সংখ্যা। আর এ সংখ্যার নিচেই চাপা পড়েছিল একটি জীবন, একটি সংসার, এক মায়ের সব স্বপ্ন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস হাসপাতালের করিডর, থানার বারান্দা, মর্গের তালিকায় হন্যে হয়ে খুঁজেছেন হারানো স্বজনরা। সবশেষ কেউ কেউ বলতেন, বেঁচে থাকুক বা না থাকুক, অন্তত কবরটা দেখান। সেই আকুতি থেকেই অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের পরিচয় শনাক্তে উদ্যোগ নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এক মাসের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় রায়েরবাজারে দাফন হওয়া অজ্ঞাতনামা ১১৪টি শহীদের মধ্যে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। একটি মৃতদেহের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে। তবে এখনো ১০৫টি মরদেহের দাবিতে কোনো আবেদন আসেনি।

Manual7 Ad Code

সিআইডি বলছে, উত্তোলনকৃত মরদেহ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় এটি সংগ্রহ করা হবে। কেউ কখনো লাশের দাবি করলে সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, উত্তোলনকৃত মরদেহের বেশিরভাগই ছিন্নমূল শিশু-কিশোর।

সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নয়টি আবেদনকারীর মধ্যে আটটি শহীদ পরিবারের প্রিয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি একটি মৃতদেহের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে। এ উদ্যোগ শহীদদের মর্যাদা রক্ষা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতের বিচারিক ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে এমন সংবেদনশীল কার্যক্রম পেশাদারিত্ব এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ কার্যক্রম নিখোঁজ শহীদদের পরিচয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিয়েছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, উত্তোলনকৃত মরদেহ থেকে যে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে, তা দীর্ঘ সময় সিআইডির সংরক্ষণে থাকবে। যে কেউ লাশের দাবিদার হিসেবে আবেদন করলে সঙ্গে সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। ডিএনএ ম্যাচ করলে পরিবারের কাছে ওই মরদেহ হস্তান্তর বা নম্বরকৃত কবরের ঠিকানা জানিয়ে দেওয়া হবে। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের মাধ্যমে শহীদদের মর্যাদা রক্ষা, ভবিষ্যতের বিচারিক ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।

রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফনকৃত মরদেহের বেশিরভাগই ছিন্নমূল মানুষের বলে দাবি করেন তৎকালীন মোহাম্মদপুরে দায়িত্বপালনকালী এক পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ওই সময়ে যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে যাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি, তাদের এখানে দাফন দেওয়া হয়। আবার যাদের চেহারায় ছিন্নমূল বা ভবঘুরে মনে হয়েছে বা চার-পাঁচ দিনেও খোঁজ মেলেনি, তাদেরও কবর দেওয়া হয়। তবে ডিএনএ শনাক্তে আরও পরিচয় মিলতে পারে বলে আশা করেন তিনি।

 

এদিকে গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যখন শনাক্তকৃত কবরগুলো স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তখন রায়েরবাজার কবরস্থানে নেমে আসে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। একদিকে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের হদিস পাওয়ার আনন্দ; অন্যদিকে সেই সন্তানই আর কোনোদিন ফিরবে না এ সত্যকে মেনে নিতে না পারার তীব্র আর্তনাদ।

দেখা গেছে, দেড় বছর পর প্রিয় সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম। মাটির ঢিবি জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, যেন সেই মাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার সন্তানের শরীর।

তার পাশে যাত্রাবাড়ীতে নিহত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম ছেলের কবরের সামনে বসে পড়েন। কাঁপা গলায় বলেন, ‘বাবা, তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।’

Manual5 Ad Code

মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিমের মা জোসনা বেগম আর তার স্ত্রী কবরের মাটিতে পানি ঢালছিলেন নীরবে। চোখের পানি আর পানির ফোঁটা এক হয়ে যাচ্ছিল বালির ওপর। কেউ কবরের পাশে লাগানো ছোট গাছে হাত বোলাচ্ছিলেন যেন গাছটার ভেতর দিয়েই সন্তানের স্পর্শটা অনুভব করা যায়।

লাশ শনাক্তকালে উপদেষ্টারা যা বললেন : লাশ শনাক্তকরণ কার্যক্রম ও তার ফলাফল উপস্থাপন করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, মিনেসোটা প্রটোকল মেনে এখানে কবরস্থ হওয়া ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে শনাক্ত আটজন জুলাই যোদ্ধার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আরও একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান। বাংলাদেশে কখনো এত সংখ্যক লাশ একসঙ্গে কবর থেকে তোলা হয়নি।

Manual1 Ad Code

উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘এখানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া জুলাই যোদ্ধাদের পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্র তার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করে। সেই গুরুদায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই অজ্ঞাতনামা শহীদদের পরিচয় শনাক্তকরণে একটি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। এ কাজটি সম্পন্ন করতে সিআইডির ফরেনসিক টিমগুলো অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীরপ্রতীক) বলেন, ‘এ শনাক্তকরণের ফলে শহীদদের পরিবারগুলো অন্তত জানতে পারছে তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে বা তারা কোন স্থানে শায়িত আছে। এটা তাদের জন্য ও জাতির জন্য এক বিরাট মানসিক শান্তির কারণ।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফরেনসিক চিকিৎসকরা প্রতিটি মৃতদেহের ময়নাতদন্ত পরিচালনা করেছেন এবং সিআইডির নিজস্ব ফরেনসিক ডিএনএ ও কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি আমাদের দেশের ফরেনসিক সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Manual1 Ad Code

পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৮ জন : ১. মো. মাহিন মিয়া (৩০)। তার বাবার নাম গাজী মামুদ ও মায়ের নাম জোসনা বেগম। মাহিনের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার ফুলপুর গ্রামে। মাহিন মারা যান ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। তার জন্ম ১৯৯৪ সালে। ২. আসাদুল্লাহ (৩১); তার বাবা মৃত আব্দুল মালেক এবং মায়ের নাম আশেয়া বেগম। শহীদ আসাদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানা। আসাদুল্লাহ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; তার জন্ম ১৯৯৩ সালে। ৩. পারভেজ বেপারি (২২); বাবা সবুজ বেপারি ও মা শামসুন্নাহার। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বারোহাটিয়া গ্রামে। ২০০২ সালে জন্ম নেওয়া পারভেজ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ৪. রফিকুল ইসলাম (৫১); বাবা মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার। রফিকুল ইসলামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর থানার সাতকাছিনা গ্রামে। ১৯৭৩ সালে জন্ম নেওয়া রফিকুল মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ৫. সোহেল রানা (৩৭); বাবা মৃত মো. লাল মিয়া ও মা রাশেদা বেগম। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায়। সোহেল রানার জন্ম ১৯৮৭ সালে; মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। ৬. রফিকুল ইসলাম (২৮); বাবা মৃত খোরশেদ আলম। রফিকুলের বাড়ি ফেনী জেলায়। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয় এই তরুণ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ৭. ফয়সাল সরকার (২৫); তার বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। ফয়সালের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার কাচিমারা গ্রামে। ফয়সালের জন্ম ১৯৯৯ সালে; তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২২ জুলাই। ৮. ৫৮ বছর বয়সী কাবিল হাসানের বাবা মৃত বুলু মিয়া, মায়ের নাম ছামেনা বেগম। তার বাড়ি ঢাকার মুগদা থানার গলিতে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২ আগস্ট।

জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা ছিলেন কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমজীবী, কেউ তরুণ, কেউ সংসারের একমাত্র ভরসা। আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে তারা কেউ ভাবেননি, অচেনা কবর হবে তাদের শেষ ঠিকানা।

সিআইডি প্রধান ছিবগাত উল্লাহ বলেন, এই ১১৪ জনের মধ্যে রোড অ্যাকসিডেন্টসহ আরও অনেকভাবে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা ছিলেন। আমরা অনেক লাশের শরীরে বুলেটের পিলেট (গুলি) পেয়েছি। এগুলো নিয়ে আমাদের বড় প্রকাশনা হবে।

সিআইডি জানায়, রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি লাশ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে সিআইডির ফরেনসিক দলের নেতৃত্বে। লাশ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং ফের কবরস্থ করার প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code