ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পর পুলিশের সবকটি ইউনিটিতে প্রকট আকার ধারণ করে যানবাহন ব্যবস্থাপনা। অবস্থা এমন যে, থানা ও ফাঁড়িগুলোতে যানবাহন নেই বললেই চলে। গাড়ির অভাবে ঠিকমতো অপারেশন কার্যক্রম চালাতে পারছে না পুলিশ। ফলে আসামি গ্রেপ্তার নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অতিরিক্ত অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলেও গাড়ি সংকটে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। ইতিমধ্যে পুলিশের জন্য নতুনের পাশাপাশি অতিরিক্ত যানবাহন চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে জানানো হয়, দ্রুত যানবাহন ক্রয় করতেই হবে। এজন্য অন্তত ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। পরে মন্ত্রণালয় ২৭৫ কোটি টাকার গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত দিলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সম্পূর্ণ অর্থ পায়নি পুলিশ। ফলে অর্থাভাবে পুরোদমে গাড়ি কিনতে পারছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র।
পুলিশ সংশ্লিষ্টরা জানায়, ৫ আগস্টের আগে ও পরে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের অনেক ঘটনা ঘটেছে। থানা ও ফাঁড়িসহ একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুটের পাশাপাশি ৪৪ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো লুট হওয়া সব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এসব ঘটনায় মামলার তদন্ত ও আসামিদের বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার বাইরে ও ভেতরে এবং আশপাশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কিছু দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা গেলেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। জানা গেছে, পুলিশের স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, দুর্বৃত্তদের হামলায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য মারা যান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার মধ্যে ২১টিসহ পুলিশের ২১৬টি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে পুড়ে যায় ১৩টি থানা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের বেশ কিছু টহল গাড়িও। বেশি ক্ষতি হয়েছে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, ভাটারা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর ও উত্তরা পূর্ব থানা। ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে থানা, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর থানা এবং নারুলী পুলিশ ফাঁড়ি, জয়পুরহাট সদর থানা, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ থানা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, দিনাজপুর সদর থানাসহ অসংখ্য স্থাপনায় হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। এসব থানার প্রায় সব ধরনের যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। ওই সময় ৫২৬টি সরকারি গাড়ি আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ৫৩৩টি গাড়ি ভাঙচুর ও অকেজো করে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫৯টি যানবাহন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশি কার্যক্রমের গতি বাড়াতে তোড়জোড় শুরু করে। বিশেষ করে যানবাহন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর দফায় দফায় বৈঠক করে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যানবাহনের সংকট কাটাতে পুলিশের জন্য জিপ, ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন পিকআপসহ ৪৩১টি যান কেনা হবে। এর জন্য বাজেট ধরা হয় ২৭৫ কোটি টাকা। প্রায় ছয় মাস ধরে চিঠি চালাচালি হলেও এখনো অর্থ হাতে পায়নি পুলিশ সদর দপ্তর। তবে পুলিশ সদর দপ্তর আশাবাদী, চলতি মাসের মধ্যেই চলার মতো যানবাহন ক্রয় করা সম্ভব হবে। এজন্য কাজ চলছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানান ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা।
Manual2 Ad Code
তিনি বলেন, ৭২২টি গাড়ি কেনার জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় ৪৩১টি যানবাহন কেনার জন্য ২৭৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দের সম্মতি দেয়। কিন্তু এখনো গাড়ি কেনা যায়নি। বড় কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে কিছু যানবাহন পাওয়া গেছে। ফলে থানাগুলো ‘আপসের মাধ্যমে’ গাড়ি রিকুইজিশন করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার পুলিশের বিষয়ে বেশ আন্তরিক। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন যানবাহন বহরে যুক্ত হবে।
Manual4 Ad Code
বর্তমানে চার হাজারের বেশি যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যালট পেপার পরিবহন, ব্যালট বাক্স নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে পুলিশকে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দাঙ্গা দমন বা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত চলাচলের জন্য কয়েক হাজার সচল পিকআপ ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহনের প্রয়োজন হয়। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিদ্যমান জীর্ণ গাড়ি নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে বিশাল দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হতে পারে।
জানা গেছে, গত বছর ২৯ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে গাড়ি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০টি ডাবল কেবিন পিকআপ, ১৫২টি মোটরসাইকেল, ৬৬টি অন্যান্য যানবাহনসহ ৪১৮টি যানবাহন কেনা হবে বলে ওই সময় জানানো হয়। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। পুলিশের কেনার তালিকায় ৩৮টি জিপ, ২৫০টি ডাবল কেবিন পিকআপ, ৫৬টি সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ, ২০টি ট্রাক, ১২টি প্রিজন ভ্যান, আটটি রেকার এবং চারটি এপিসিসহ ৭২২টি যানবাহনের চাহিদা ছিল।
Manual6 Ad Code
বর্তমানে কর্মরত কয়েকটি থানার ওসি জানান, থানায় আগে যে গাড়ি ছিল, এখন তার অর্ধেকের কম রয়েছে। নতুন করে তিনটি গাড়ি পেলেও তা দৈনন্দিন কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের সময় যখন জনবল ও মুভমেন্ট দ্বিগুণ হবে, তখন সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কবে নতুন যানবাহন আসবে তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো উপায় না দেখে লেগুনা বা অন্য যানবাহন রিকুইজিশন করতে হচ্ছে। বিনিময়ে তাদের ভাড়ার টাকা দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের পরিবহন নীতিমালায় বলা আছে, পুলিশের একটি গাড়ি আট বছরের বেশি চালানোর নিয়ম। কিন্তু অনেক গাড়িই ২০ বছরের বেশি রাস্তায় চলাচল করছে। অনেক সময় মাঝ রাস্তায় গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনগুলো দিয়েই পুলিশ কাজ চালাচ্ছে। গাড়ি নষ্ট হলে পুলিশের কারখানায় দিলেও সঠিকভাবে মেরামত করা যাচ্ছে না।