প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

একাদশ জাতীয় নির্বাচন: চার পুলিশ কর্মকর্তায় কর্ম কাবার

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
একাদশ জাতীয় নির্বাচন: চার পুলিশ কর্মকর্তায় কর্ম কাবার

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

‘রাতের ভোট’ নিয়ে দেশ-বিদেশে যে সমালোচনার ঝড় নানা কৌশলে তা আড়াল করে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতের ভোট ডাকাতিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এনে। এ ছাড়া শতভাগ ভোট পড়ার অবিশ্বাস্য হিসাব, ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগসহ নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল রাতের ভোটখ্যাত একাদশ সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনের ৭ বছর পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তে মিলেছে ভোট ডাকাতির তথ্য। জানা যায়, সেসময় ২০৮টি সংসদীয় আসনের ১৬ হাজার ৮৮৩টি কেন্দ্রে ভোট ডাকাতির নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন পুলিশের শীর্ষ চার কর্মকর্তা।

Manual5 Ad Code

 

দুদকের নথি অনুযায়ী, এই চার কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণে নেন। ভোট ডাকাতির নায়করা হলেনÑ পুলিশের সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। এককথায় প্রশাসনের সব স্তরের লোকদের টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ রাখা হয়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং মামলার প্রস্তুতিও চলছে। এ বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া না গেলেও দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বিষয়টি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে।

Manual5 Ad Code

 

দুদক সূত্র জানিয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত ভোট ডাকাতি। ওই নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র, ব্যালট ও ভোটার সবই ছিল লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা। বাস্তবে ভোটগ্রহণের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা হয়, ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। আবার ভোট শেষ হওয়ার আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল ফলাফল। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে মাত্র ১৪টিতে আওয়ামী লীগের বিজয়ের তথ্য উঠে আসে পুলিশের বিশেষ শাখার একটি জরিপে। ওই তথ্য হাতে পাওয়ার পরই ক্ষমতা ‍কুক্ষিগত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এজন্যই ভাগে ভাগে দায়িত্ব দেওয়া তার আস্থাভাজনদের।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই সময়ে বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত ২০৮টি সংসদীয় আসনকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়। ওই আসনগুলোর ১৬ হাজার ৮৮৩টি কেন্দ্রে ভোটের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। অনেক কেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা হয়। কোথাও কোথাও মৃত, বাতিল কিংবা এলাকাছাড়া ভোটারদের উপস্থিতি দেখিয়ে কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়; যা বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

 

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, এই চার পুলিশ কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ওসি, নির্বাচন কমিশনের একাংশের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সংঘবদ্ধ দলীয় চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ, ভোটগণনা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করেন। মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বাধ্য হয়েই এসব নির্দেশ পালন করেন। নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ বা সাহস কোনোটাই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি নির্দেশ পালনকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। জানা যায়, টাকা জোগাড় করতেও গঠন করা হয়েছিল আলাদা একটি কমিটি। সেখানে শেখ রেহেনা, সালমান এফ রহমান ও এইচটি ইমামের নাম উঠে এসেছে।

 

দুদক আইন অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে জরুরি পত্র পাঠিয়েছে দুদক। চিঠিতে অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে। জানা যায়, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তৃত নথির তালিকা চেয়েছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, রেজাল্ট শিট ও ভোটগণনার বিবরণী, ভোটগ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ণ পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্ট ও পোলিং এজেন্টদের পরিচয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা, এমনকি ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমে দায়িত্ব পালনকারীদের তথ্যও। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার নথি চাওয়া হয়েছে।

Manual4 Ad Code

 

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুতর যে তথ্য জানা যায়, তা হলোÑ পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব ছিল নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যদিও তা না করে সেই বাহিনীর তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বই হয়ে ওঠে ভোট কারচুপির নিয়ন্ত্রক শক্তি। নথিতে বলা হয়েছে, এই অপকর্মকে বৈধতা দিতে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক আনা হয়, যারা নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলে প্রচার করেন। দুদক সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধান শেষে একাধিক মামলায় এই চার পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হতে পারে।

 

দুদকের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক স্থানে দেখা গেছে কেন্দ্রে ভোটারের একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা রয়েছে। এর মাঝে বাতিল হওয়া ভোটেরও একটা সংখ্যা আছে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে মোট ভোটারের শতভাগ উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। সেখানে বাতিল হওয়া অর্থাৎ মৃতদেরও উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।

 

দুদকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দিনাজপুর-১ আসনের পাল্টাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২৪৬১ জন। বিভিন্ন কারণে বাতিল হয় ১৯৯ ভোট। সে হিসেবে বৈধ ভোটার সংখ্যা ছিল ২২৬২ ভোট। কিন্তু ফলাফলে ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে ২৪৬১ ভোট এবং শতভাগ। লালমনিরহাট-১ আসনের নাজিরগুমানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২২২৭ জন। বিভিন্ন কারণে বাতিল হয় ২২৯ ভোট। সে হিসেবে বৈধ ভোটার সংখ্যা ছিল ১৯৯৮ ভোট। কিন্তু ফলাফলে ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে ২২২৭ ভোট এবং শতভাগ। একইভাবে কুমিল্লা-১ আসনে মুজাফ্ফর আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২০৭৮ জন। বাতিল ভোট ৪৩৬। যে কারণে বৈধ ভোটার সংখ্যা ১৬৪২। কিন্তু এই কেন্দ্রেও ফলাফলেও ভোট কাস্টিং দেখানো হয় শতভাগ। লক্ষীপুর-১ আসনেও নিচহরা সমাজ কল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২২৪০ জন। এই কেন্দ্রে বাতিল ভোটার সংখ্যা ২০৮। বৈধ ভোটার সংখ্যা ২০৩২। কিন্তু ফলাফলে ভোট কাস্টিং শতভাগ দেখানো হয়। এভাবেই সারা দেশের সব আসনেই টার্গেট করা কেন্দ্রগুলোতে ভোট ডাকাতি করা হয়।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঘটনা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এখন দুদকের অনুসন্ধান সেই অভিযোগগুলোকেই নথিভুক্ত বাস্তবতায় রূপ দিচ্ছে; যা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

Manual1 Ad Code

যা বললেন বর্তমান আইজিপি: পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, পুলিশের শীর্ষ চার কর্মকর্তা ভোটের অনিয়মে যুক্ত হয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট শাসনামলে। এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অনেক শহীদের আত্মত্যাগের পর আমরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এসেছি। পুলিশে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code