প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতিতে ক্ষত, সংকট নিরসন অনিশ্চিত

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতিতে ক্ষত, সংকট নিরসন অনিশ্চিত

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের অর্থনীতি নাজুক সময় পার করছে। কর্মসংস্থান নেই, বেকারত্ব বাড়ছে, বিনিয়োগে খরা, বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতি নেই। রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা, মূল্যস্ফীতি কমছে না। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে। সরকারের অর্থ সংকট কমছে না। অর্থনীতির এমন বেহালেও সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকে দাবি করেছেন, দেশের অর্থনীতি ভালো আছে। নির্বাচিত সরকারের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ছয় মাসে অনুমোদিত প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নেও সমস্যা হবে না। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা সরকারের দায়িত্বশীলদের এমন মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়েও ভিন্ন মত দিয়েছেন। নির্বাচিত সরকার এলেও এ সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে কবে গতি আনা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, অর্থনীতি আগের চেয়ে ভালো আছে। নির্বাচিত সরকার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন দেবে। এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। হিসাব মেলানোর জন্য কিছু প্রাক্কলন করা হলেও তা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। একটা নির্বাচিত সরকার এলেও রাতারাতি দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। শিল্প-কারখানা নির্মাণে সময় লাগবে। রাজস্ব আয় বাড়বে না। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের বাড়তি অর্থ জোগাড়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে। এটা স্পষ্ট, অর্থনীতির সংকট না কাটলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতির প্রায় সব সূচকেই নেতিবাচক ধারা। অর্থনীতির এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বেকারত্ব দূর করতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। ধাপে ধাপে অর্থনীতিতে গতি আনতে হবে। তবে কতদিনে এই সংকট দূর হবে, তা অনিশ্চিত। অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে জিডিপিতেও প্রবৃদ্ধি আসবে।

গত ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময় পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অর্থনীতিতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’-এর জানুয়ারি সংস্করণে, ‘জিডিপির প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পরের অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।’

Manual3 Ad Code

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানান, ‘একটি দেশের অভ্যন্তরে এক বছরে চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবা বাজারের সামষ্টিক মূল্যই হচ্ছে জিডিপি। নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন বৃদ্ধিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বোঝায়। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসাব কষা হয় সাধারণত প্রধান পাঁচটি খাত–উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ এবং কৃষি খাতের হিসাব থেকে। এখানে নতুন আরও কিছু খাত যুক্ত হয়েছে।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে না। রাজস্ব আয় কীভাবে বাড়বে। সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম সূচকগুলোর প্রায় সবগুলো নিম্নগামী। গত কয়েক বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে খারাপ হয়েছে। বর্তমানে তলানিতে নেমেছে।’

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিনিয়োগের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা না থাকলে কেন একজন ব্যক্তি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় করবে? বর্তমানে বেশির ভাগ নীতি ব্যবসাবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীদের পরামর্শ ছাড়াই সংশোধিত শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদের হারে ছাড় নেই। এলসি (ঋণপত্র) খোলায় কড়াকড়ি। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়েছে। বন্দরের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও দেশের অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা বাংলাদেশ সরকার যেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ার হিসাব করুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে অর্থনীতির এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব থেকে জানা যায়, গত জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্যানুসারে, কোভিডের বছর বাদ দিলে গত ২৫ বছরের মধ্যে গত অর্থবছর বাংলাদেশে সর্বনিম্ন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, গত এবং চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক প্রায় একই আছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ার তেমন প্রভাব নেই অর্থনীতিতে।

বিবিএসের তথ্যানুসারে, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে। গত কয়েক বছরে দেশে বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব বাড়ছে।

Manual1 Ad Code

হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। প্রতিবছর দেশে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে আসছে। গত কয়েক বছরে ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। আগের বেকারের সঙ্গে নতুন বেকার যোগ হয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক বছর থেকে দেড় বছর পর ৬ শতাংশে আসতে অর্থনীতিতে যে প্রস্তুতি দরকার, তা যে সরকারই দেশ পরিচালনায় থাকবে তার পক্ষে কঠিন হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের শিল্প খাতে মোটাদাগে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ে খরচ বেড়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের কারণে ব্যবসার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৬ শতাংশে আটকে আছে। বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীদের পরামর্শ না নিয়েই অর্থনীতির অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দূরত্ব বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে। নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করলে শিল্প খাত শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকির কথা হলো, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর করায় ঋণের প্রবাহ কমেছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code