জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র চার দিন। এরই মধ্যে সহিংসতা, নাশকতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা বাড়ছে। ইসি সচিবালয়সহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে ভোটের মাঠে সংঘর্ষ, হামলা, উত্তেজনা, বিরোধসহ দেড় শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ৪২ হাজার ৭৬১ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
Manual8 Ad Code
ইসির আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনসংক্রান্ত ৩৪৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২১২টি মামলা হয়েছে এবং প্রায় আড়াই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, লঘুদণ্ডের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সহিংসতা পুরোপুরি ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
তফসিলের পর সহিংসতা, হতাহত
Manual1 Ad Code
ভোটের ঠিক চার দিন আগে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে যমুনা অভিমুখে গতকাল ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। নির্বাচনের অল্পদিন আগে উত্তপ্ত রাজপথ ভোটারদের মনে নানা শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৩ থেকে ১৫০টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম দফার নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর (২২-৩০ জানুয়ারি) মাত্র এক সপ্তাহেই সংঘর্ষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫টিতে। বেশির ভাগ ঘটনায় দলীয় সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তেজনা ও বিরোধ থেকেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের ধরন ছিল–দলীয় হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং ভাঙচুর।
ভোটের মাঠে উদ্বেগ লুট হওয়া অস্ত্র
নির্বাচনের মাঠে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ ফাঁড়ি ও সরকারি স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া প্রায় ৫ হাজার ৭৪৯ অস্ত্রের মধ্যে এখনো এক হাজারের বেশি অস্ত্রের হদিস নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ চিহ্নিত অনেক অপরাধী কিনে নিয়েছে। তাদের হাতে আসা অস্ত্র দিয়ে নানা অপকর্ম হচ্ছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
গতকাল শুক্রবার নীলফামারীতে নির্বাচনি মতবিনিময় সভায় ইসি আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র অপরাধী ও উগ্র গোষ্ঠীর হাতে গেলে ভোটের সময় তা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘সহিংসতা ও অবশিষ্ট অস্ত্রের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটার উপস্থিতি ও সুষ্ঠু ভোটের সম্ভাবনা কমবে।’
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল্যায়নে এবার দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় ২০ হাজার কেন্দ্রকে ‘রিস্কি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বড় শহরের কিছু কেন্দ্রকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকায় সেখানে বাহিনীগুলোর নিজস্ব ওয়্যারলেস ও বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসির প্রস্তুতি
Manual5 Ad Code
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটের আগে ও পরে মোট আট দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে। আনসার-ভিডিপি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ৭ থেকে ৯ লাখ সদস্য নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। ইসি আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করেছে, যেখানে এ পর্যন্ত ৩৪৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন: মামলা-জরিমানা
Manual5 Ad Code
ইসির তথ্য অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২১২টি মামলা হয়েছে এবং প্রায় আড়াই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কী বলছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের দুর্বল অবস্থান, লুট হওয়া অস্ত্র ও ধারাবাহিক সহিংসতা এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তাঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার ও ইসির পক্ষ থেকে ভোটারদের সামনে স্পষ্ট নিরাপত্তা পরিকল্পনা তুলে ধরা সম্ভব না হলে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে।’
ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হবে বলে আমরা আশা করছি।’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘যেকোনো ধরনের মব-সহিংসতা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভোটের আগে ও ভোটের সময় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।’
সব প্রস্তুতি ও আশ্বাসের পরও বাস্তবতা হলো–সহিংসতার সাম্প্রতিক চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা এবং লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়টি ভোটের মাঠে বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে–সেদিকেই তাকিয়ে দেশবাসী।