কীভাবে বুধবার রাতের শঙ্কা বৃহস্পতিবার ভিন্ন রূপ নিলো
কীভাবে বুধবার রাতের শঙ্কা বৃহস্পতিবার ভিন্ন রূপ নিলো
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Manual4 Ad Code
Manual4 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
নির্বাচনের আগের দিন বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতটি ছিল অনিশ্চয়তা, গুঞ্জন আর উদ্বেগের। সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা খবর— ভোটকেন্দ্র দখল, সিলসহ ব্যালটবাক্সের ভুল ছবি প্রকাশ। সব মিলিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছিল চাপা উৎকণ্ঠা। তার সঙ্গে ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য। সামাজিক যোগাযোগের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে শহর থেকে গ্রামে। সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আগের রাতে এই পরিস্থিতি হলে, ভোটের দিন সব ঠিক থাকবে তো?
কিন্তু বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে চিত্রটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হতে যাওয়া ভোটের লাইনে জনগণ দাঁড়াতে শুরু করে ৭টার আগেই। দুপুর ১২টার সময় নির্বাচন কমিশন থেকে ঘোষণা করা হয়— ৩২ শতাংশ ভোট পড়েছে। সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ভোটদেওয়ার ছবি শেয়ার করা, শান্তিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ দেওয়া। কীভাবে আগের গুজবের আবহ বদলে গেলো উৎসবে জানতে চাইলে ভোটার, প্রার্থী ও বিশ্লেষকরা বলছেন— আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি মূলত ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি নিশ্চিত করেছে এবং দলগুলো ভীষণ চাপে থাকলেও ভোট প্রদানের সময়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। যে জেন-জি ও নারী ভোটার এবারের নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব রাখবে বলে বলা হয়েছিল, সেই নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে জেনজি-দের দৃশ্যমানতা কম ছিল বলে মনে করেন বিভিন্ন কেন্দ্রে দায়িত্বপালনকারী সাংবাদিকরা।
ঢাকা-৮ আসনের ভোটার ব্যাংক কর্মকর্তা জেসমিন ভোট দিতে কেন্দ্রে যান বিকালে। তিনি বলেন, কাল রাতে ভেবেছিলাম ভোট দেবো না। সকাল থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলাম। আসলে বুধবার রাতে গুজব ও রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা শঙ্কাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে খেয়াল করে দেখলাম, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। দুপুরের পর তাই কেন্দ্রে এসেছি।
নির্বাচনের দিন ঢাকার আসনগুলোতে দায়িত্বপালনকারী সাংবাদিকরা মনে করেন, বুধবার রাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিলো, সেটা বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন নয়। নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলে এবং মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় না থাকলেও সকালের উপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল মানুষ আসবে। তারা বলেন, কোনও কোনও কেন্দ্রে লোক তেমন না থাকলেও বেশিরভাগ কেন্দ্রে নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
Manual1 Ad Code
বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কথা। নির্বাচন শুরুর পর, মিরপুরের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, যত ছোট কেন্দ্রই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত আছেন। নির্বাচন শুরুর পর জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘বিএনপি দলীয় সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্র দখল করেছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেসব কেন্দ্র দখলমুক্ত করেছে সেনাবাহিনী। দেশজুড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। সেনাবাহিনী এই দায়িত্ব অব্যাহত রাখলে দেশ একটা ভালো নির্বাচন উপহার পাবে।’’
কেন্দ্রে জেনজি-দের দৃশ্যমানতা কম ছিল!
নির্বাচনের দিন সকাল থেকে ভোটের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়লেও ভোটের তারতম্যের মূল ফ্যাক্টর জেনজি বা তরুণ প্রজন্মের দৃশ্যমানতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বুথের সামনে লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের বড় অংশই ছিল মধ্যবয়সী ও প্রবীণ। জুলাই আন্দোলনের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণদের উচ্ছাস, সে কারণে তাদের দৃশ্যমানতা আরও বেশি থাকবে বলে আশা করা হয়েছিল। এর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দেড় বছরে রাজনৈতিক অনাগ্রহ ও হতাশা কাজ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। তারা মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল বা প্রক্রিয়ায় তাদের ভোটের প্রভাব সীমিত। আবার ডিজিটাল সক্রিয়তা তাদের যতটা বেশি সবসময়, বাস্তব অংশগ্রহণ কমই দেখা যায়। আগের রাতের অস্থিরতার কারণেও কিছু উপস্থিতি কম হয়ে থাকতে পারে। ভোট দিতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ছুটির কারণে বড় অংশ দেশের বাড়ি গেছে, হয়তো ভোটটা তার ঢাকায়। আবার আমার বন্ধুদের অনেকে আসতে আগ্রহ দেখা য়নি, পছন্দের প্রার্থী নেই তার আসনে। এসব মিলিয়ে কম হয়ে থাকতে পারে।
Manual5 Ad Code
‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ’
নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের পেশাদারী— এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে, গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট। জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমকর্মী এবং ভোট গ্রহণে সম্পৃক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। তাদের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলেই এই বিশাল গণতান্ত্রিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’’ এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম ভোটগ্রহণের সময় শেষে ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘‘থ্যাংক ইউ বাংলাদেশ! বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। একইসঙ্গে সবচেয়ে উৎসবমুখর ভোটও!!’’
তাহলে কি বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে
Manual3 Ad Code
সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়ে ভোট দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। ভোট দেওয়া শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নাসির উদ্দীন বলেন, ‘‘আজকের ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণের দিনের শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে।’’ বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রের পথে রওনা দিয়েছে, গণতন্ত্রের এই ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাবে, এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস। আসলে কি বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে বলে মনে করেন কিনা, প্রশ্নে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘‘গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠে গেছে সেটা না বললেও, বলা যায়— গণতন্ত্রের ট্রেনের টিকিট কেটেছে। গণতন্ত্র আরও বড় ব্যাপার— বিচার বিভাগ, সংসদ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ট্রেনে উঠে পড়ার কথা বলা যাবে না। বরং বলা দরকার, নির্বাচন সেই পথের প্রথম ও প্রধান ধাপ। সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা গেছে। এই ফলাফল সব পক্ষ গ্রহণ করে, সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে— যখন নতুন সংসদ যাত্রা শুরু করবে, তখন আমরা ট্রেনে উঠে পড়ার কথা বলতে পারবো।’’
উল্লেখ্য, একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে এবার শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়। ২৯৯টি আসনে এবারের নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নেয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে ইসি। ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
কোনও বড় ধরনের ঝামেলা ছাড়া একটা সুষ্ঠু উৎসবমুখর নির্বাচন হলো। কী কী সতর্কতায় এটা সম্ভব হলো? জানতে চাইলে তথ্য উপদেস্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘‘আমার মনে হয় সবার সম্মিলিত প্রয়াস, এখানে অন্তর্বর্তী সরকার যেমন আন্তরিক ছিল, একইসঙ্গে জনসাধারণ, রাজনৈতিক দলগুলো, নির্বাচনটিকে উৎসবমুখর করার জন্য কাজ করেছে। জনগণ অনেক বছর পরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। কাজেই তাদের মধ্যে আগ্রহের পরিমাণটা অনেক বেশি ছিল। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সবসময় কাজ করেছি , সংযুক্ত থেকেছি। নির্বাচন কমিশনও সুচারুভাবেই একটা পরিকল্পনা করে নির্বাচনটা করেছে। ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো এবং দেশের সাধারণ ভোটার। তাদের সতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া এটা আমাদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব হতো না। আর নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে এটা নিয়ে আমাদের কখনোই কোনও ভিন্ন চিন্তা ছিল না। আমরা প্রথম থেকেই জানতাম এটা সুষ্ঠু হবে। কারণ এই নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনও সুযোগও নেই। কোনও প্রয়োজনও ছিল না।’’
তিণি বলেন, ‘‘যখনই যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সে নির্বাচনে ইন্টারফেয়ার করে তখনই নির্বাচনের উৎসবভাবটা উঠে যায় এবং সেটা আর সুষ্ঠু হয় না। আমাদের ক্ষেত্রে যেহেতু সেটা হয়নি, ফলে এটা সুষ্ঠও না হওয়ার কোন ওকারণ ছিল না। আর আগেই যেটা বললাম যে, জনগণ অনেক বছর পর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। তাদের মধ্যে একটা উৎসাহের ভাব ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো তাদেরকে উজ্জীবিত করতে পেরেছে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটা সুষ্ঠু এবং উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছি জাতিকে।’’