ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম আলোচিত অঙ্গীকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর মধ্য দিয়ে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা জাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে রমজানেই পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা এসেছে।
Manual3 Ad Code
প্রতিটি পরিবারের দায়িত্বশীল নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ গঠন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা— এসব অঙ্গীকারের মাধ্যমে সরকার ফ্যামিলি কার্ডকে কেবল একটি ভাতা কর্মসূচি নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও বৈষম্যহীন সামাজিক সুরক্ষার নতুন মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় সরকার। ইতিমধ্যে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন রূপরেখা দেবে। ঈদুল ফিতরের আগেই পাইলট কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ সরকারের তৎপরতাকেই ইঙ্গিত করছে।
অর্থনৈতিক সহায়তার পরিমাণের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশের নারীদের একটি সমন্বিত সহায়তা নেটওয়ার্কের আওতায় আনা— যেখানে অগ্রাধিকার পাবে হতদরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও বিধবা পরিবার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, এখন সেদিকেই নজর সবার।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি করে দিয়েছেন। পাঁচ-ছয়টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা কমিটিতে যুক্ত আছেন। শিগগিরই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এখানে যেকোনোভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ফ্যামিলি কার্ড আমাদের প্রতিশ্রতি ছিল। এটি বাস্তবায়ন করা মূল কাজ। দ্রুতই এ কর্মসূচি শুরু হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ড দ্রুততম সময়ে বিতরণ শুরু হবে এবং ঈদের আগেই কার্যক্রম শুরু করা হবে। কার্ড সরাসরি প্রতিটি পরিবারের নারীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যে ভাতা কার্ডগুলো চালু আছে তা বজায় থাকবে। ফ্যামিলি কার্ডে প্রদত্ত অর্থ আগের যেকোনো ভাতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হবে। কার্ড বাস্তবায়নের জন্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।
ডা. জাহিদ বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না এবং মধ্যস্বত্বভোগীও থাকবে না। সর্বজনীনভাবে তা বিতরণ করা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। কার্যক্রম যাতে বৈষম্যহীন ও বিতর্কমুক্ত সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হবে। তিনি জানান, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কাছে এ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ড বিএনপির নতুন উদ্ভাবন, যা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করবে।
মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, অন্যান্য ভাতা কার্ড চলমান থাকবে। ফ্যামিলি কার্ড সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হবে। আগামী তিন দিনের মধ্যে জানা যাবে কার্ডের সংখ্যা এবং এতে প্রদত্ত অর্থের পরিমাণ।
কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কত দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড স্টার্ট করতে পারি, এটি নিয়ে আজকের মিটিং ছিল। আগামী ঈদের আগেই পাইলট বেসিসে ফ্যামিলি কার্ড ওপেন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে মিটিংয়ে। এ ছাড়া কতটুকু করা যায়, কত দ্রুত করা যায়, সংখ্যায় কী হবে— এ বিষয়গুলো দুয়েক দিনের মধ্যে ফাইনাল করব।
প্রাথমিকভাবে কত টাকা দেওয়া হবে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে—প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, টাকার পরিমাণটা এ মুহূর্তে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে আমরা যেহেতু পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় পাঁচ কোটি ফ্যামিলিকে ফ্যামিলি কার্ড দেব, আমরা সেটিকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নযোগ্যভাবে শুরু করব। মূলত টাকার পরিমাণের চাইতেও সব নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের নেটওয়ার্কের মধ্যে আনাটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। পর্যায়ক্রমে এটিকে আমরা আরও উন্নত করতে পারব।
Manual3 Ad Code
তিনি বলেন, অগ্রাধিকারের দিক থেকে আমরা এ মুহূর্তে যারা হতদরিদ্র যারা প্রতিবন্ধী, বিধবা— এ ধরনের পশ্চাৎপদ, আমরা তাদের গুরুত্ব দিয়ে দেব। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সবাই আসবেন।
এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে।
বাস্তবায়নে ১৫ সদস্যের কমিটি : আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই এ কার্ড প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি ও অর্থনৈতিক শাখার অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন— মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা মাহদী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব, অর্থ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত ডিজাইন প্রণয়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি প্রণয়ন; প্রাথমিক পর্যায় দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটিতে ১টি করে উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ; নারীদের জন্য বিদ্যমান অন্য কোনো কর্মসূচিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না তা পর্যালোচনা; সুবিধাভোগীদের ডাটাবেজ প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডাটাবেজ আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল এমআইএস প্রণয়নের সুপারিশ এবং আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করার লক্ষ্যে কমিটি আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।
শনিবারও অফিস করবেন প্রধানমন্ত্রী : নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন থেকে শনিবারও অফিস করবেন। প্রশাসনে গতি আনার লক্ষ্যে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শনিবার অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উনি অফিস করলে তো আমাদেরও অফিস করতে হবে। তবে আমি আগামীকাল শনিবার এলাকায় যাব। পরের শনিবার থেকে যথারীতি অফিস করব।
এটি সবার জন্য বাধ্যবাধকতা কি না জানতে চাইতে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী অফিস করলে তো আমাদেরও করতে হবে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা বেশ প্রশংসিত হয়েছে। মন্ত্রীদের বাহুল্য খরচ না করার জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন।