প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আয় নেই, দায় শোধে বিপাকে সরকার

editor
প্রকাশিত মার্চ ১, ২০২৬, ০৯:১০ পূর্বাহ্ণ
আয় নেই, দায় শোধে বিপাকে সরকার

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

সরকারের আয়ে টান পড়েছে। এর মধ্যেও বড় বড় প্রকল্পে খরচ হচ্ছে বিপুল অর্থ। আয় নেই অথচ লাগামহীন ব্যয়। এতে বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের চাপ।
পূর্বাভাস দিচ্ছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। এর ব্যতিক্রম হলে সামনে আসতে পারে কঠিন সময়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে ঋণ-রাজস্ব অনুপাত ছিল ১৬.৯২ শতাংশ।
অথচ এর আগের বছর এই অনুপাত ছিল ১৬.৫৩ শতাংশ। এই অনুপাত ১৮ শতাংশের বেশি হলে বিপদে পড়তে পারে দেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) ১৮ শতাংশকে দেখছে সতর্কসীমা হিসেবে। মোটাদাগে, দেশের রাজস্ব আয় দ্রুত না বাড়লে আরো বাড়তে পারে ঋণ পরিশোধের চাপ।

পরিসংখ্যান বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৮.৯৯ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ১৭.০৩ শতাংশ।

২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.২৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৬৮.৮২২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৮.৪৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে সরকার নিট ৫.৮৩২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে।
পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে প্রায় ২.৫১০ বিলিয়ন ডলার।

Manual6 Ad Code

ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি চাপ বাড়ছে ঋণ পরিশোধেরও। সেই সঙ্গে সুদ পরিশোধের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ২.৯৬ শতাংশ। ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ঋণ অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৮.১২ শতাংশে।

Manual4 Ad Code

লন্ডনের গবেষকদের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ঋণ বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩৭৭ শতাংশ। সাদা চোখে গত দেড় দশকে ঋণের পরিমাণ প্রায় চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।

অন্যদিকে ঋণে জর্জরিত হলেও এ সময়ে বাড়েনি রাজস্ব আয়। উল্টো বছরের পর বছর অপচয়ের প্রকল্প, দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে রাজস্ব ঘাটতি ক্রমেই বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।

বড় লক্ষ্যের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতেই বড় ঘাটতি। সবচেয়ে বড় আয়কর খাতে। এ খাতে ঘাটতি ২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের এমন চিত্র ভোগাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকেও।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মূলত অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং সর্বশেষ এনবিআরের আন্দোলনের কারণে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। এ ছাড়া প্রতিটি অর্থবছরেই ছিল বড় রাজস্ব ঘাটতি।

আইএমএফের ‘আর্টিকল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপেছে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ ৩০ বিলিয়ন ডলার। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮৮.৭৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের জিডিপির তুলনায় এই হার এখন ৪১ শতাংশ। এই ঋণের মধ্যে ১০১.২৪ বিলিয়ন ডলার অভ্যন্তরীণ ও ৮৭.৫৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক। ২০৩০ সাল নাগাদ ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা। এই সমস্যা সমাধানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘বিএনপি সরকার আগামী বাজেটে এই অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।’

Manual4 Ad Code

গবেষণায় ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নেওয়া ৪২টি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ব্যয় দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অপচয় হয়েছে। সরাসরি সরকার-টু-সরকার চুক্তির প্রকল্পগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের তুলনায় ৪০০ শতাংশের বেশি ব্যয়বহুল হয়েছে। গবেষণা বলছে, দুর্নীতি ও অতিমূল্যায়ন চলথে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে ২০২৮ থেকে ২০৩২ সময়কে।

ইআরডি সূত্র আরো জানায়, বিদায়ি অর্থবছরে রেকর্ড ৪০৯ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭৪ কোটি ডলার বেশি। মূলত সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায়ও পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব। তবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, দরপত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি না বাড়ালে বৈদেশিক ঋণের চাপ ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

ঋণ ব্যবহার করে রিটার্ন যাতে সময়মতো পাওয়া যায় সেদিকে লক্ষ রাখার বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঋণ বাড়ছে, সেই সঙ্গে পরিশোধও বাড়ছে। আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ বেড়ে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক মুদ্রার জোগান না বাড়লে ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়বে। ফলে অর্থনীতিতে দুর্দশা নেমে আসতে পারে। তাই ঋণগুলোর ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।’

Manual8 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code