নিজ নিজ আসনের উপজেলা পরিষদে বসার জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামে এমপিদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা করছে সরকার। এই সিদ্ধান্তের কথা গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
Manual1 Ad Code
সরকারের এই সিদ্ধান্তে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিলেও স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা এর বিরূপ প্রভাবের কথা বলছেন।
Manual3 Ad Code
তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা খর্ব হবে। কারণ উপজেলা পরিষদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা ও যে সুযোগ রয়েছে সেটা বাধাগ্রস্তের আশঙ্কা তৈরি হবে। এর ফলে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। কারণ সংসদ সদস্য তার ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করবেন, প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও বিরোধ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, সংসদ সদস্য ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ও এর জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। অতীতে দেখা গেছে, এমপিরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেন। এই অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করাই নয়, রাজনৈতিক বিভেদ তৈরি করার শঙ্কা আরও জোরালো করবে। অনেকের দাবি, উপজেলা পরিষদের মধ্যে না করে এটা অন্য যেকোনো জায়গায় করলে তাতে করে স্বার্থের সংঘাত দূর করা সম্ভব হবে। সেটা জনকল্যাণমুখীও হবে। এদিকে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য কক্ষ রাখা হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হবে। এতে উপজেলা পরিষদের ওপর এমপিদের খবরদারির জায়গা তৈরি হতে পারে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বা প্রভাব বিস্তারের জন্যই করা হচ্ছেÑ এমন ধারণাকে আরও পোক্ত করবে।
গত ৩১ মার্চ নির্বাচনি এলাকায় সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা করে দেওয়ার বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ। এরপর বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা না হলেও গত মঙ্গলবার অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরামর্শে প্রতিটি উপজেলা পরিষদের দোতলায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বসার জন্য একটি কক্ষ প্রস্তুত করে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই কক্ষের নাম হবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, উপজেলা পরিষদের মধ্যে এমপিদের অফিস কক্ষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আরও দুর্বল হতে পারে। স্থানীয় সরকারের ওপর সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির ফলে জটিলতাও তৈরি হতে পারে। এতে করে নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া দলীয় মনোনয়ন ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপিদের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলে তা আরও মাথাচাড়া দেবে এবং দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার পরিষদে সংসদ সদস্যের কোনো ভূমিকাই আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ না। অর্থৎ আইন ও সংবিধান বলে না যে স্থানীয় সরকারের কোনো বিষয়ে তারা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করুক। শারীরিকভাবে উপজেলা পরিষদের ভেতরে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতির যে বন্দোবস্ত করা হচ্ছে তাতে করে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াতে হস্তক্ষেপের একটা সরাসরি সুযোগ করে দেওয়া হবে। যেখানে সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনের বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করা। এই তিনটা কাজের কোনোটিই উপজেলা পরিষদে তাদের বসার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এজন্য এটা নিশ্চিভাবেই বলা যায়, উপজেলা পরিষদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা ও সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করা হবে। নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে পারেন উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। কারণ সংসদ সদস্য তার ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করবেন, প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন। যার ফলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের সেবা প্রদানের সুযোগ সংকুচিত হবে। এতে করে সাধারণ মানুষও প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
Manual1 Ad Code
এদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের চিন্তা থেকে এমন দাবি আনা হয়েছে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটা স্থানীয় সরকারের ভূমিকাকে খর্ব করার শামিল। ক্ষমতা খর্ব করার পাশাপাশি এটি স্থানীয় সরকারের বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করবে। সংসদ সদস্যদের এ ধরনের ভূমিকার কোনো এখতিয়ার নেই।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মাথায় স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশে সিটি করপোরেশন আইন, জেলা পরিষদ আইন, উপজেলা পরিষদ আইন ও পৌরসভা আইন সংশোধন করা হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সদস্য, কাউন্সিলরদের কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণ করে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে আইনে বিধান যুক্ত করা হয়। এই ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের।
বিএনপি ক্ষমতায় এসে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করেছে বিএনপি সরকার। যদিও বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল, আদালতের রায়ে দণ্ডিত না হলে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হবে না। মৃত্যুজনিত কারণে পদ শূন্য না হলে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হওয়ায় ভবিষ্যতে সরকার চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো জনপ্রতিনিধিকে সরিয়ে দিতে পারবে। যদিও আওয়ামী লীগ আমলের আইনে বলা ছিল, কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে শুধু আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে তবেই সাময়িক বরখাস্ত করা যাবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, আমার ভুল না হলে যেখানে এমপিদের অফিসের জন্য আলাদা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেখানে উপজেলা কমপ্লেক্সের মধ্যে কেন তাদের জন্য অফিস বরাদ্দ দিতে হবেÑ এটা বোধগম্য নয়। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের ওপর একধরনের প্রভাব বিস্তার করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে করে স্বার্থের সংঘাত তো ঘটবেই। সাধারণ মানুষও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে বহু সমালোচনার জন্ম দেবে বলেও মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের সময় স্থানীয় সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের যে ট্রেন্ড তৈরি হয়েছিল, এ সিদ্ধান্ত তারই ধারাবাহিকতা মনে হচ্ছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, এমপিরা যদি এখন একটা অফিস নিয়ে বসেন, স্থানীয় শাখা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটা কনফ্লিক্ট তৈরি হয়ে যাবে। মানে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কনফ্লিক্ট তৈরি হবে। ওখানে যদি একটা অফিস হয়, তাহলে তো এমপিরা আরও শক্ত করে বসবে। ফলে ওই উপজেলা পরিষদ বা অন্যান্য যে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তাদের সঙ্গে এক ধরনের কনফ্লিক্ট তৈরি হবে।
প্রকাশ্যে হাইকমান্ডের বিরোধিতা করছে না কেউ : বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না। সুনামগঞ্জের জমালগঞ্জ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুল হক বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে জনগণের সরাসরি যোগাযোগের একটা পথ উন্মোচন হবে। এ ছাড়া যেকোনো কাজ সমন্বিতভাবে করার পথ তৈরি হবে। এটিকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবেও অবহিত করেন তিনি।