উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে পুলিশের চিঠি, নড়েচড়ে বসেছে সরকার
উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে পুলিশের চিঠি, নড়েচড়ে বসেছে সরকার
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
Manual1 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
হঠাৎ করেই উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে পুলিশের চিঠিতে নড়েচড়ে বসেছে সরকারের হাইকমান্ড। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওই বিশেষ চিঠি পুলিশের সবকটি ইউনিটিতে পাঠানো হয়েছে। চিঠি পেয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। উগ্রবাদী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নোটেও এ তথ্য জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে তুরস্ক থেকে এক ব্যক্তি কলকাঠি নাড়ছেন।
একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এরই আলোকে পুলিশ চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে সবকটি ইউনিটকে।
এদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা পালিয়ে গেলেও তাদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে পুলিশ আছে দুশ্চিন্তায়। তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠন নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে মাঝেমধ্যে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা উগ্রবাদীদের সক্রিয় থাকার বিষয়টি উড়িয়েও দেননি। ওই সময়কার ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ‘দেশে জঙ্গি নেই’ বলে মন্তব্য করে আলোচিত হন। এমনকি ‘আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারধর করেছে, কীসের জঙ্গি’ এমন মন্তব্যও তখন তিনি করেছিলেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘দেশে উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা চলে আসছিল। কিন্তু সেটা দৃশ্যমান ছিল না। এখন সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়ার কারণেই সরকার এ সতর্কতা জারি করেছে। কোনো তথ্য থাকলে জননিরাপত্তার জন্য বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনার জন্য করা হয়ে থাকে। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলে তিনি আশা করেন।’
Manual6 Ad Code
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) রেজাউল করিম বলেন, ‘দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুলিশ সবসময় সতর্ক থাকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ সব স্থানে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘আমরা উগ্রবাদের বিষয়ে তথ্য পেয়েছি এবং তা নিয়ে কাজ করছি। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’ হামলার পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা গেছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি; সুতরাং আমার মনে হয় এখন মন্তব্য করার সময় আসেনি।’
সম্প্রতি উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা এখনো সক্রিয় আছে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো তাদের নিশানায় রয়েছে। পাশাপাশি এতে পতিত আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার ইন্ধন আছে বলেও তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তথ্যগুলো পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্তাদের ও সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে। তথ্য পেয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বিশেষ বৈঠকও করেছেন। এরই আলোকে গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের গোপনীয় শাখা থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির কপি হাইওয়ে, এপিবিএন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, এটিইউ, পিবিআই, সিআইডিপ্রধান, র্যাব মহাপরিচালক, এসবিপ্রধান, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর, নৌপুলিশের প্রধান, সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল, ডিএমপি কমিশনার, ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান, সিএমপি, কেএমপি, বিএমপি, এসএমপি, আরএমপি, জিএমপি, আরপিএমপি কমিশনার, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মসসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ প্রতিটি ইউনিটিতে পাঠানো হয়।
Manual3 Ad Code
চিঠিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়। সেখানে উগ্রবাদী সংগঠনের নাম নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, তবে ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। কবে, কোন ইউনিটের তরফে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাও সেখানে স্পষ্ট করা হয়নি।
চিঠিতে গ্রেপ্তার ইসতিয়াকের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ, দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ বা সেনাবাহিনীর স্থাপনা ও তাদের সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বরের মতো জায়গা রয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এসব ব্যক্তি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি ও সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ ধরনের সতর্কতা নিয়মিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থারই অংশ। উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। চিঠিতে খুবই স্পর্শকাতর তথ্য আছে। ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্পর্শকাতর চিঠিটি ই-মেইলে প্রতিটি ইউনিটপ্রধানের কাছে পাঠানোর মধ্যেই ফাঁস হয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। চিঠিটি ফাঁস হওয়ার পর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পুলিশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা থেকে যেসব জরুরি ও গোপনীয় চিঠিপত্র, প্রতিবেদন ফাঁস হয়ে যায়, তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে পুলিশের কাজকে অসফল করে তোলার হীন কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ‘দেশে জঙ্গি নেই’ বলে মন্তব্য করে আলোচিত হন। এর মধ্যেই ৩১ জানুয়ারি জঙ্গি সন্দেহে জিয়া উদ্যান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আহসান জহির খান নামে এক ব্যক্তিকে। ওই ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে পরে আরও চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় সিটিটিসি। ওই মামলায়ই গত ২ এপ্রিল নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ‘নব্য জেএমবির’ সঙ্গে জড়িত সন্দেহে হবিগঞ্জ থেকে আটক এক শিশুকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানায় ডিএমপি। পর দিন ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আহসান জহির ও তার সহযোগীদের সঙ্গে হবিগঞ্জের ওই শিশুর যোগাযোগ আছে বলে জানানো হয়। সে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে শিয়া মসজিদ, পুলিশের চেকপোস্ট ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা ও উসকানি দিত বলে দাবি করছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, সারা দেশে উগ্রবাদী হামলার নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই তৎপরতার পেছনে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের যোগসূত্র নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিদেশে বসে থাকা কিছু মাস্টারমাইন্ড তুরস্ককে ‘সেফ প্যাসেজ’ হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে নাশকতা করার পরিকল্পনা করছে। পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট মাঠপর্যায় থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদর দপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন পেশ করা হয়, তা তেমন একটা আমলে নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার তরফে একাধিকবার উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কাবিষয়ক প্রতিবেদন দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা। বেশ কিছু দিন আগে ওই ইউনিটের গোয়েন্দারাই খবর পেয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সদস্যকে ধরার পর তাদের হামলার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এর আগেও ইউনিটটি বিভিন্ন উগ্রবাদ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত সদস্যদের ধরে আইনের আওতায় এনেছে বলে জানা গেছে।
সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তা নতুন সরকারের জন্য ভয়ের ও চ্যালেঞ্জের বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে বলেই এ সতর্কবার্তা। এটা নাগরিকদের জন্য ভয় ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অতীতেও উগ্রবাদীদের আইনের আওতায় নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ছিল, এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে উগ্রবাদীদের আটকের মধ্যে যাতে রাজনৈতিক কোনো ফায়দা না হয়, সেটি নজরে রাখতে হবে।
সূত্র জানায়, দেশে জঙ্গি বা উগ্রবাদ নেই এমন বয়ানের মধ্যেই উগ্রবাদীরা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। এমন আশঙ্কা থেকেই শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে টানা কয়েকবার প্রতিবেদন পাঠানো হয় সরকারের শীর্ষ মহলে। পুলিশ সদর দপ্তরে জরুরি সভা হয়। সেখানে উঠে আসে উগ্রপন্থিদের হামলা নিয়ে শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশের দুটি উগ্রবাদী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এজেন্টরা এ দেশে আসছে নানা অজুহাতে। লস্কর-ই-তৈয়বা পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত একটি সালাফি জিহাদবাদী ইসলামি সশস্ত্র সংগঠন। ১৯৯০ সালে হাফেজ মোহাম্মদ সাঈদ, আবদুল্লাহ ইউসুফ আযযাম ও জাফর ইকবাল আফগানিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বা প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের নিকটে মুরিদ নামক স্থানে সংগঠনটির অবস্থান। তা ছাড়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) একটি দেওবন্দি জিহাদি উগ্রবাদী গোষ্ঠী। সংগঠনটি মূলত আফগান-পাকিস্তান সীমান্তের উভয় পাশজুড়ে সক্রিয়।