প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১২ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সরকার জেরবার ঋণের বোঝায়

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ণ
সরকার জেরবার ঋণের বোঝায়

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

উত্তরাধিকার সূত্রে নতুন সরকারের কাঁধে চাপে বিশাল ঋণের বোঝা। সেটি সামাল দেওয়ার আগেই বহুমাত্রিক চাপে পড়ে সরকার। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতির ভেতরে এক ধরনের চক্রাকার সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে ব্যয় বাড়ছে কিন্তু আয় সে অনুপাতে বাড়ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ এখন চলে যাচ্ছে বাধ্যতামূলক খাতে, যেখানে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, পরিচালন ব্যয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তৃতি মিলিয়ে রাজস্ব আয়ের বড় অংশ গ্রাস করছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং কৃষিঋণ মওকুফের মতো প্রতিশ্রুতিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। অথচ এই ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

 

Manual4 Ad Code

রাজস্ব আদায়ে এই দুর্বলতা সরকারকে ক্রমশ ঋণনির্ভর করে তুলছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতই প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর প্রবণতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

 

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অনেক আগ থেকেই সরকার চাপে রয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই চাপকে বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমানো ছাড়া এই চাপ মোকাবিলার বিকল্প নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণ প্রায় ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি। বাকি অংশ দেশীয় উৎস থেকে সংগৃহীত। সঞ্চয়পত্রে রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকসহ অন্যান্য উৎসে প্রায় আট লাখ কোটি টাকা। এই ঋণের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশীয় ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে, যা সুদ ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকা। এর পরেও অর্থের চাহিদা মেটাতে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে নিয়মিত নিলাম ক্যালেন্ডারের বাইরে গিয়ে এই বিশেষ নিলামের প্রবণতা সরকারের তহবিল সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঋণসংগ্রহের এই প্রবণতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল এবং প্রথম চার মাসে সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধই বেশি করেছিল। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ৩২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। ৯ মাসে এই খাত থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যার ফলে মোট ঋণস্থিতি বেড়ে পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

Manual6 Ad Code

পলিসি ডায়লগ সেন্টারের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে তা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় একটা অংশ খরচ হয়ে যায়। তাই আগামী অর্থবছরে এসব বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।’

Manual7 Ad Code

বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সরকার জুনের মধ্যে প্রায় ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালালেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এমনকি চলমান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি খাতের ব্যয় বৃদ্ধিই এখন সবচেয়ে বড় চাপ হিসেবে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অর্থ বিভাগের হিসাবে অর্থবছরের শেষ চার মাসেই এই খাতে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে, যেখানে পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের শেষভাগেই প্রায় পুরো বরাদ্দের সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে কৃষি ও সারের ভর্তুকি যুক্ত হলে সামগ্রিক ব্যয়চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঋণের সুদ পরিশোধ এখন সরকারি ব্যয়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধুমাত্র সুদ পরিশোধে, যার পরিমাণ ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদেই গেছে ৫৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদে ৯ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা।

Manual6 Ad Code

এদিকে রাজস্ব আদায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি শুল্কÑ সব খাতেই বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। আয়কর খাতে ঘাটতি সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, ভ্যাটে প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং আমদানি শুল্কে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অতীতের যেকোনো মাসিক আদায়ের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। অথচ চলতি বছরে সর্বোচ্চ আদায় হয়েছে জানুয়ারিতে, যা ছিল ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code