গত ২০ এপ্রিল আনুমানিক বিকেলে ৪টায় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমেদ হোসেন তার দায়িত্ব পালন শেষে হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। মহাখালীতে পুরাতন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পেছনের একটি গলিতে আকস্মিকভাবে দুজন এসে তাকে ছুরি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করে চলে যায়। এই ঘটনার এক মাস হতে না হতেই হত্যার হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠি পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানকে। চিঠিতে শুধু তাকে নয়; তার পুরো পরিবার শেষ করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনার এক দিন পর গত ১৫ মে রাতে শরীয়তপুরে হামলার শিকার হন ডা. নাসির ইসলাম নামে আরও এক চিকিৎসক।
রোগীর মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ তুলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি এতটাই গুরুত্বর আঘাত পান যে, উন্নত চিকিৎসা দিতে দ্রুত তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসে সরকার। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিউইতে চিকিৎসাধীন আছেন। এর আগে চাঁদপুরে হামলার শিকার হন, ড্যাবের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. বশির আহাম্মদ খান।
এই কটি ঘটনাই নয়; প্রায়ই ঘটছে চিকিৎসকদের ওপর হামলার হচ্ছে এমন ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চিকিৎসকদের ওপর হামলা, অপমান ও কর্মস্থলে অনিরাপত্তার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। একদিকে হামলার শিকার হওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে অন্যদিকে তারা হতাশও হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চিকিৎসকরা সেবা দেওয়ার আগ্রত হারিয়ে ফেলবেন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। সেজন্য চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিতের তাগিদও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও নজরে এসেছে। তিনি সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে নির্দেশ দিয়েছেন।
চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকদের ওপর হামলার নেপথ্যে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে রোগী এবং চিকিৎসকদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব। চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক বিষয়। রোগীরা সেটি অনেক সময় বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না। আবার চিকিৎসকও হয়তো তাদের সেভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেন না। দেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায়, চিকিৎসকদের ওপর স্বাভাবিকভাবেই বেশি চাপ থাকে। সেই কারণে রোগী বা তার স্বজনের সঙ্গে বেশি কথা বলা বা বুঝিয়ে বলার সময় তারা পান না। কিছু ক্ষেত্রে যে দুই একজন চিকিৎসকের অসতর্কতা থাকে না, তাও নয়। তবে তার জন্য হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
Manual3 Ad Code
কেউ কেউ মনে করেন, চিকিৎসকদের দুর্বল মনে করাও হামলার একটি কারণ হতে পারে। আরেকটি বড় কারণ হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া। এ ছাড়া বিদেশে রোগী টানতে কৌশলে দেশের চিকিৎসকদের দুর্নাম ছড়াতে একটি সিন্ডিকেট এর পেছনে কাজ করতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘হয়তো মানুষজন বিক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করছে। কিন্তু এটা একেবারেই কাক্সিক্ষত নয় এবং এটা মানুষের কাজও নয়। এগুলো করার কেন সাহস পাচ্ছে, সেটা সরকারের দেখা উচিত। শুধু হাসপাতালে কেন হামলা? অনিয়ম তো আরও অনেক জায়গাতেই আছে। সেখানে তো সাহস করে না। হয়তো এটা নরম ক্ষেত্র, ডাক্তারদের হামলা করলে তেমন কিছু হয় না- এটাও একটা বিষয় হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘শরীয়তপুরের ঘটনা আমরা সর্বোচ্চভাবে বিভিন্ন দিক থেকে জানার চেষ্টা করছি, রোগীকে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসে, তখন তার পালস বিপি রেকর্ড করা যাচ্ছিল না। তারপর তাকে রেফার করেছে, কিন্তু তারা যাবেন না। তারা ওখানেই থাকবেন। মারা যাওয়ার পর ডাক্তারকে ফিজিক্যাল এসল্ট করল। এ রকম ঘটনা যদি ঘটতেই থাকে তাহলে ডাক্তাররা তো ট্রিটমেন্ট করা বন্ধ করে দেবেন। ডাক্তারদের কেউ ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। অনেক টেকনিক আছে, আমি রোগী এভয়েড করতে পারি। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো রোগী যেমন ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করতে পারে, ডাক্তারও কিন্তু রোগীর চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করতে পারে। এটা আইনেই আছে। কিন্তু আমরা সবসময় চাই, কেউই যেন আমাদের দ্বারা বিব্রত না হন, এই ঘটনার পরে চিকিৎসকরা যেভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, সারা দেশে যদি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেত। তখন কি হতো? আমরা কেউই চাই না, যে মানুষ বিপাকে পড়ুক। সেজন্য আহ্বান জানাব ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটান।’
একের এক এ রকম ঘটনার বিষয়ে কথা হচ্ছিল আরেক চিকিৎসকের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই চিকিৎসক বিরক্তির সঙ্গে বলছিলেন, ‘আমার সন্তান ডাক্তার হলে আমি চাইব না, সে এই দেশে থাকুক, এই দেশের মানুষের চিকিৎসা করুক। আমি তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেব। দরকার নেই এখানে থেকে মার খাওয়ার।’
চিকিৎসকের ওপর হামলা, হাসপাতালে ভাঙচুর এটা নতুন কিছু নয়। আগেও হতো এখনো হচ্ছে। এই ঘটনা বাড়তে শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের সময় থেকে। ওই সময় থেকে এই পর্যন্ত বেশ কয়েকবার নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিতের দাবিতে কর্মবিরতিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন চিকিৎসকরা। সাময়িক সমাধান হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। বন্ধ হয়নি চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের লাঞ্ছিতের ঘটনা।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, ‘হয়তো বা চিকিৎসকদের নেতৃত্ব তৈরি হয়নি, যে কারণে এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। অনেক মানুষ খারাপ কিন্তু সবাইকে তো শাস্তি দিতে পারবেন না। শাস্তি দিতে হবে দুই চারজনকে। যেটা দেখে বাকিরা যাতে ভয় পায় এবং শিক্ষা নেয়। ওই জায়গাটাতে আমার মনে হয়, দুর্বলতা আছে। দিন যতই যাচ্ছে এটা বাড়ছে। এটার দায় কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের নয়, স্বরাষ্ট্র বিভাগের।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা নিয়ে যদি বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে কনসার্ন। তিনি সব সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এটা রাতারাতি হবে না। এতে একটু সময় লাগবে।’
Manual3 Ad Code
শরীয়তপুরের ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে অনেকেই ক্ষোভ এবং দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল গত ১৭ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে দেশের স্বাস্থ্য খাতের নাজুক পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকদের চরম নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, একজন রোগীর মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বজনদের আবেগ ও কষ্ট আমরা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করি। তবে কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসক, নার্স বা হাসপাতাল কর্মীদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট করার ঘটনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের কর্মকা- শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দক্ষ চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে এবং স্বাস্থ্য খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
এদিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার প্রতিবাদ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের দাবিতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ড্যাব গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। এতে ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন ড্যাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান এবং সঞ্চালনা করেন ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল।
Manual5 Ad Code
শরীয়তপুরের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক আস্থা একটি মানবিক স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি। আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিটি রোগীর নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাই, সংযম, সহমর্মিতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে।’