সহজভাবে বলতে গেলে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হলে নিচে নেমে আসে। আর সেটাই হচ্ছে বৃষ্টি।
এবারের প্রাক-বর্ষা মৌসুমে সেই বাতাসের হয়েছে ছন্দপতন। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
এতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এপ্রিল বছরের উষ্ণতম মাস।
এই মাসে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ১১৯ মিলিমিটার। সেখানে হয়েছে ১৯৬ মিলিমিটার।
অর্থাৎ ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সিলেট বিভাগে ৬০৩ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ঢাকায় ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি, চট্টগ্রামে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি, ময়মনসিংহে ১৫০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি, রংপুরে ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ, খুলনায় ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ, বরিশালে ১৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কেবল রাজশাহী বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কম বর্ষণ হয়েছে। এপ্রিলে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের দিন হচ্ছে ০৮ দিন, তবে বর্ষণ হয়েছে ১১ দিন। ঢাকায় ১১ দিন, ময়মনসিংহে ১৫ দিন, চট্টগ্রামে ০৮ দিন, সিলেটে ২৩ দিন, রাজশাহীতে ৭ দিন, রংপুরে ১০ দিন, খুলনায় ৯ দিন ও বরিশালে ৮ দিন বৃষ্টি হয়েছে।
বাতাসের ছন্দপতন
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে কালবৈশাখীর ঝড়, বজ্রঝড় হয়। এই সময় উত্তর থেকে পশ্চিমা লঘুচাপের নিয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম বাতাসের সংমিশ্রণে বজ্রমেঘ ও বৃষ্টিমেঘের সৃষ্টি হয়। এবার উত্তর দিক থেকে দেশে পশ্চিমা লঘুচাপ ডিসেম্বর থেকে আসেনি। যে কারণে এবারের শীতেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। চার মাস না এসে পশ্চিমা লঘুচাপ একবারে আসায় শক্তিশালী বৃষ্টি বলয়ের তৈরি হয়েছে। ফলে এত বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আমাদের দেশে বৃষ্টিপাত হয় দু’টি কারণে-পশ্চিমা লঘুচাপ ও দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে।
বর্ষাকালে সাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে আসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। পশ্চিমা লঘুচাপ আসে ভূমধ্যসাগর থেকে হিমালয় হয়ে। আসার সময় প্রচুর ঠাণ্ডা বাতাস নিয়ে আসে।
Manual5 Ad Code
এবার নভেম্বরে পশ্চিমা লঘুচাপ একবার এসেছিল। এরপর চার মাস আসেনি। শীতের সময় এটি যখন আসে, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। নিয়ম হলো প্রতি মাসেই অন্তত একবার করে আসা। চার মাস কোনো কার্যক্রম ছিল না। বর্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত (প্রি-মনসুন) পশ্চিমা লঘুচাপ আসে। এবার দীর্ঘমেয়াদে আসেনি। এখন এপ্রিলে থাকে হিট ওয়েভ। চার মাস না আসার কারণে যখন এসেছে, একবারে এসেছে কয়েকটি। এর মধ্যে আবার একটি ৮ থেকে ৯ দিন স্থায়ী ছিল, যা ছিল শক্তিশালী। ফলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালের পর ৯ বছরের মধ্যে এবার এই কারণে বেশি হলো। সে সময় এপ্রিলে ১০৪ মিলিমিটার গড় বৃষ্টি হয়েছিল। তবে এটি অস্বাভাবিক নয়।
চার মাস না এসে একসঙ্গে একাধিক পশ্চিমা লঘুচাপ কেন এলো, তার ব্যাখ্যায় এই আবহাওয়া বিজ্ঞানী বলেন, এটি প্রকৃতিরই একটি ভারসাম্য। অনেকটা অতিথি যখন আসে, আসতেই থাকে-এমন। এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। একসঙ্গে কয়েকটি না এলে কিন্তু বেশি বৃষ্টি অনুভূত হতো না। কারণ হিট ওয়েভ থাকত।
বৃষ্টি ও বজ্রমেঘ
পশ্চিমা লঘুচাপ ভূমধ্যসাগর থেকে দেশে ঠাণ্ডা বাতাস নিয়ে আসে। আর বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বাতাস প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে দেশে প্রবেশ করে। বৃষ্টির মেঘ তৈরি হওয়ার জন্য জলীয় বাষ্পযুক্ত গরম বাতাসের সঙ্গে উত্তর দিক থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ লাগে। ড. মো. বজলুর রহমান বলেন, জলীয় বাষ্প ওপরে ওঠে সংমিশ্রণের সময় লাটিমের মতো ঘূর্ণায়মান অবস্থার সৃষ্টি হয়। এতে তৈরি হয় বৃষ্টিমেঘ ও বজ্রমেঘ।
প্রভাব কি ক্লাইমেট চেঞ্জ না অন্য কিছু
এবার প্রি-মনসুনে বৃষ্টিটা গত তিন-চার বছর তেমন হয়নি। ড্রাই ছিল। এবার বৃষ্টিটা হচ্ছে। এটি প্রাকৃতিক কারণেই হচ্ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ মো. তারিফুল নেওয়াজ কবিরও।
Manual4 Ad Code
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর বৃষ্টিহীনতা ও অত্যধিক তাপপ্রবাহের কারণে এবার বৃষ্টি বেশি মনে হচ্ছে। তবে এটি অস্বাভাবিক নয়।
সেন্ট্রাল পার্ট অব ইন্ডিয়ায় তাপমাত্রা বেশি থাকলে সেটার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়ে। তখন তাপপ্রবাহ টানা থাকে-গত কয়েক বছর যে অবস্থা ছিল। এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তারিফুল নেওয়াজ কবির আরও বলেন, অনেকেই একে ক্লাইমেট চেঞ্জ বলেও চালিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ এল নিনোর প্রভাব বলছেন। তবে এল নিনো এখন নিউট্রাল অবস্থায় আছে। জুন-জুলাইয়ের শেষের দিকে সক্রিয় হবে। তাহলে এল নিনোর প্রভাবও বলা যাবে না।
বর্ষা কখন শুরু
মে মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু তথা বর্ষা দেশের দিকে অগ্রসর হবে। জুনের প্রথম দিকে দেশের আকাশে বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এবারের বর্ষায় অস্বাভাবিক বৃষ্টির আভাস।
মে মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ২৩৫ মিলিমিটার, তবে পূর্বাভাস বলছে ২২০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার হতে পারে। জুন মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ৪৬৫ মিলিমিটার, তবে পূর্বাভাস আছে ৪৫০ থেকে ৪৭০ মিলিমিটার বর্ষণের। আর জুলাই মাসে ৫৩৫ মিলিমিটার বর্ষণ স্বাভাবিক হলেও ৫২০ থেকে ৫৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই সময়ে ৮ থেকে ১০ দিন মাঝারি, ২ থেকে ৩ দিন তীব্র কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে এই তিন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা
এপ্রিলের শেষের দিকে টানা অতিভারী বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে নেত্রকোণা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। এখনো নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বর্ষায় বড় বন্যার আভাস নেই।
এই ছয় জেলায় অন্তত তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ কর্মসূচি শাখা-১-এর উপ-সচিব মোহাম্মদ হোসেন। মন্ত্রণালয় থেকে পরিবারপ্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে সহায়তাও দিচ্ছে সরকার।