সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমানে কয়েক মিনিট কাটালে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে দুটি বিষয়। একটি দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, অন্যটি আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, তর্কবিতর্ক ও ভবিষ্যদ্বাণী।
দিন যত গড়াচ্ছে, বিশ্বকাপের আবহ তত হয়ে উঠছে উত্তেজনাকর। নিশ্চয়ই আর কয়েক দিন বাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রায় পুরোটায়ই থাকবে ফুটবলের আলোচনা। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই নয়, ফুটবলপ্রেমী বাঙালিরা সর্বত্র বর্তমানে অপেক্ষা করছে এই মহোৎসবের।
আগামী ১১ জুন পর্দা উঠছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসর ঘিরে এরই মধ্যে উন্মাদনায় মেতে উঠেছে কোটি কোটি মানুষ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বিশ্বকাপ ফুটবল।
উৎসবের অপেক্ষায় দেশকোথাও প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর প্রস্তুতি চলছে, কোথাও চলছে জার্সি কেনার ধুম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের সমর্থকরা নিজেদের দলের সম্ভাবনা নিয়ে সরব। সব মিলিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ঘিরে আবারও উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।
এবারের বিশ্বকাপ নানা কারণে বিশেষ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে এই আসরে। অনুষ্ঠিত হবে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ।
ফলে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক মাসেরও বেশি সময়জুড়ে টানা ফুটবল উৎসব। সেই উৎসব ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও জার্সির বর্ণিল আয়োজন।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ হলো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে খুনসুটি, বন্ধুদের মধ্যে তর্কবিতর্ক কিংবা ম্যাচের আগে-পরে হাস্যরস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেক এলাকায় সমর্থক গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে খেলা দেখার আয়োজন করে। বড় পর্দায় ম্যাচ সম্প্রচার, জার্সি পরে সমর্থন জানানো এবং জয় উদযাপন—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে সামাজিক মিলনমেলার উপলক্ষ।
এবারের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গভীর রাত ও ভোরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গ্রুপ পর্বে প্রতিদিন একাধিক ম্যাচ মধ্যরাত, ভোর কিংবা সকালের দিকে মাঠে গড়াবে। বাংলাদেশে কোন চ্যানেল খেলা সরাসরি দেখাবে, এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে সময়সূচি কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও সমর্থকদের উৎসাহে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং রাত জেগে খেলা দেখার পরিকল্পনা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ সামনে এলেই বাংলাদেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়—ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। যদিও ইউরোপের শক্তিধর দলগুলোরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থক রয়েছে, তবু দেশের বেশির ভাগ ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়জুড়ে থাকে এ দুই লাতিন আমেরিকান পরাশক্তি। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা শহর, উপজেলা, গ্রামের বাজার পর্যন্ত এখন দেখা যাচ্ছে প্রিয় দলের পতাকা। কোথাও বাড়ির ছাদে উড়ছে আকাশি-সাদা পতাকা, কোথাও আবার হলুদ-সবুজ রঙে সেজেছে পুরো মহল্লা। অনেক এলাকায় শোভাযাত্রা, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও সমর্থক সমাবেশও শুরু হয়েছে।
বিশ্বকাপের সময় ফুটবল আর শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিণত হয় একটি সামাজিক উৎসবে। চায়ের দোকান, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফুটবল।
বিশ্বকাপ উৎসব ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায় জার্সির বাজারে। রাজধানীর গাউছিয়া, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, চাঁদনী চক, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন মার্কেটে কয়েক সপ্তাহ ধরেই জার্সির বিক্রি বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও পর্তুগালের জার্সিও বিক্রি হচ্ছে ভালো।
Manual1 Ad Code
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলিস্তানের ফুটপাত ও স্পোর্টস মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, বিশ্বকাপ সামনে রেখে জমে উঠেছে জার্সির ব্যবসা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে জার্সি কিনতে ভিড় করছেন। অনেকেই নিজ নিজ এলাকার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী জার্সি সংগ্রহ করছেন।
Manual5 Ad Code
ফুটপাত থেকে শুরু করে শোরুম—সবখানেই সারি সারি সাজানো বিভিন্ন দেশের জার্সি। ফুটপাতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে জার্সি পাওয়া গেলেও উন্নতমানের জার্সির দাম এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। তার পরও ক্রেতাদের আগ্রহে কোনো ভাটা নেই।
গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শামসুল মিয়া জানান, গ্রামাঞ্চলে এখনো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে জার্সির দাম কিছুটা বেড়েছে। তার পরও ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। তরুণ-তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি জার্সি কিনছে আমার এলাকায়।’
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল গেট সংলগ্ন ফুটপাতে জার্সি বিক্রি করা নয়ন মিয়ারও একই অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, ‘স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাই বেশি কিনছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সির বিক্রি সবচেয়ে বেশি।’
জার্সির পাশাপাশি জমে উঠেছে পতাকার ব্যবসাও। ছোট হাতপতাকা থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির পতাকা—সবকিছুরই রয়েছে দারুণ চাহিদা। বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ ফুট দীর্ঘ পতাকা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। কোথাও কোথাও এরই মধ্যে দীর্ঘ পতাকা নিয়ে শোভাযাত্রাও হয়েছে। বিশ্বকাপ চলাকালে শোভাযাত্রা আরো বাড়বে ধারণা করা যায়।
Manual7 Ad Code
পতাকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগররা বলছেন, বিশ্বকাপ এলেই তাঁদের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ছোট-বড় দর্জিঘরগুলোতে দিন-রাত চলছে কাজ। অনেক মৌসুমি শ্রমিকও এই সময়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
Manual7 Ad Code
১১ জুন প্রথম বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ফুটবলের সেই প্রতীক্ষিত মহাযজ্ঞ। তখন দেশের প্রতিটি পাড়া, মহল্লা, চায়ের দোকান কিংবা ক্যাম্পাসে মানুষ মেতে উঠবে বিশ্বকাপের উন্মাদনায়।