২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সম্ভাবনা সত্ত্বেও সম্পদ কর বাতিল -বাজেট ২০২৬-২৭
২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সম্ভাবনা সত্ত্বেও সম্পদ কর বাতিল -বাজেট ২০২৬-২৭
editor
প্রকাশিত জুন ৪, ২০২৬, ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
নিউজ ডেস্ক:
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরাসরি ‘সম্পদ কর’ চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে নতুন কোনো কর ব্যবস্থার পরিবর্তে পুরোনো সারচার্জ ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। এনবিআরের এই পিছটানের কারণে সরকার বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। অথচ, আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড অনুসরণ করে যদি এই সম্পদ কর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যেত, তাহলে রাজস্ব আদায় ২০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো বলে মনে করছে খোদ এনবিআর।
অন্যদিকে, দেশের আয়কর খাতে বড় ধরণের কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবারের বাজেটে। এর অংশ হিসেবে ন্যূনতম কর ও উৎসে করের মধ্যে একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি করদাতাদের স্বস্তি দিতে যুক্ত হচ্ছে ‘অটোমেটিক রিফান্ড’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর ফেরতের সুবিধা। এর ফলে কোনো করদাতা যদি ভুলবশত বা নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত কর জমা দিয়ে থাকেন, তবে কোনো ধরনের বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই মাত্র ৩ মাসের মধ্যে সেই টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার কাছে ফেরত চলে আসবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রচলিত সারচার্জ ব্যবস্থা বাতিল করে সরাসরি ‘সম্পদ কর’ চালুর একটি পরিকল্পনা করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই উদ্দেশ্যে এনবিআর কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশের সম্পদ করের মডেল বিশ্লেষণ করে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। নতুন এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্যই ছিল কর ব্যবস্থার পুরোনো চিত্র বদলে ফেলা।
Manual3 Ad Code
প্রস্তাবিত এই নতুন নিয়মে সম্পদের ন্যূনতম করমুক্ত সীমা আগের মতোই ৪ কোটি টাকা রাখার কথা বলা হয়েছিল, তবে কর গণনার পদ্ধতিতে আনা হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। আগে করদাতারা তাদের ‘আয়করের ওপর ভিত্তি করে’ সারচার্জ পরিশোধ করতেন; কিন্তু নতুন খসড়া অনুযায়ী কর দিতে হতো সরাসরি ‘মোট সম্পদের মূল্যের ওপর’। এই খসড়ায় ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদকে করছাড় দিয়ে ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর ০.৫০ শতাংশ কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়লে করের হারও ধাপে ধাপে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছিল। খসড়া অনুযায়ী, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের জন্য ১ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের জন্য দেড় শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে মোট সম্পদমূল্যের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সরাসরি সম্পদ কর হিসেবে দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছিল।
ধনীদের সম্পদের ওপর আরোপিত বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা থেকে সরকার বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে দেশে বর্তমানে ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদ রয়েছে এবং সারচার্জের আওতায় এসেছেন এমন নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা ৩০ হাজার ৮০৪ জন। এই ধনী করদাতারা তাদের আয়কর রিটার্নে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার সম্পদ ঘোষণা করেছেন। এই বিশাল পরিমাণ সম্পদের বিপরীতে বছরে মোট সারচার্জ আদায় হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এটি মোট ঘোষিত সম্পদের মাত্র ০.২৯ শতাংশ। তবে সারচার্জ ব্যবস্থা বাতিল করে সরাসরি সম্পদ কর করা হলে অন্তত ২-৩ লাখ করদাতা থেকে বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা আয়কর আদায় হতো বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
Manual6 Ad Code
আয়কর আইন, ২০২৩ এবং অর্থ আইন ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে তিন ধরনের সারচার্জ প্রচলিত রয়েছে; সম্পদের ওপর সারচার্জ, পরিবেশ সারচার্জ এবং বিশেষ সারচার্জ। এই সারচার্জগুলো কেবল সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির সাধারণ মাধ্যম নয়, বরং সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার একটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বর্তমানে চার কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদকে করমুক্ত রাখা হয়েছে, অর্থাৎ এই সীমা পর্যন্ত কোনো সারচার্জ দিতে হয় না। তবে নিট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ১০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলে করদাতাকে ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়। এছাড়া সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি টাকার কম হলেও যদি কোনো ব্যক্তির নামে একের অধিক মোটরগাড়ি থাকে কিংবা তার গৃহসম্পত্তির মোট আয়তন ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি হয়, তবে তাকেও এই ন্যূনতম ১০ শতাংশ সারচার্জের আওতায় আসতে হয়।
সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারচার্জের এই হারও ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায়। কোনো করদাতার নিট সম্পদ যদি ১০ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ২০ কোটি টাকার মধ্যে হয়, তবে তার ওপর ২০ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য হয়। একইভাবে, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের জন্য সারচার্জের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ শতাংশ। আর কোনো ব্যক্তির নিট সম্পদের পরিমাণ যদি ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ পরিশোধ করতে হয়।
বাজেট সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে করদাতারা দলিলের পুরোনো মূল্য দেখিয়ে পার পেয়ে যেতেন। নতুন নিয়মে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারিত হতো বর্তমান বাজারমূল্য বা সরকারি নির্ধারিত সর্বশেষ মৌজা মূল্য অনুযায়ী। সম্পদ কর চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অভিজাত এলাকার সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে সঠিকভাবে কর আদায় করা।
Manual5 Ad Code
তিনি আরও জানিয়েছেন, শুধু স্থাবর সম্পদ নয়, অস্থাবর সম্পদ থেকেও কর আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। যেমন— গাড়ি, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ, ব্যাংকে থাকা স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য সঞ্চয়ও এই মোট নিট সম্পদের হিসাবে যুক্ত করা হতো। তবে শেষ সময়ে এসে সেখান থেকে সরে সারচার্জ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্পদ কর চালু হলে বছরে অন্তত ৯-১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। আর অন্যান্য দেশের মডেল অনুসরণ করলে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যেত।
ন্যূনতম কর ও উৎসে কর সমন্বয় হচ্ছে
Manual8 Ad Code
আগামী বাজেটে ন্যূনতম কর বিষয়ে একটি বড় সংস্কার করতে যাচ্ছে এনবিআর, যা করদাতাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। বিশেষ করে ব্যবসায়ী এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যূনতম কর এবং উৎসে কর সমন্বয় বা রিফান্ডের ক্ষেত্রে এনবিআর একটি বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে।
মূলত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারার জটিলতা নিরসন এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতেই আগামী বাজেটে এই বড় ধরণের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। বর্তমান আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু খাতে পণ্য সরবরাহ, সেবা প্রদান কিংবা আমদানির সময় যে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়, সেটিকে আইনগতভাবে ‘ন্যূনতম কর’ হিসেবে গণ্য করা হতো। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বছর শেষে প্রকৃত আয়কর হিসাব করার পর যদি দেখা যেত যে তার কেটে নেওয়া উৎসে করের পরিমাণ মূল করদায়ের চেয়েও অনেক বেশি, তবুও সেই অতিরিক্ত টাকা ফেরত বা অন্য কোনো করের সঙ্গে সমন্বয় করার কোনো আইনি সুযোগ ছিল না।
এই কঠোর নিয়মের কারণে অনেক লোকসান করা বা কম মুনাফা করা প্রতিষ্ঠানকেও বছর শেষে পকেট থেকে বিশাল অঙ্কের কর গুনতে হতো, যা ব্যবসা সচল রাখার মূল পুঁজিতে বড় ধরণের আঘাত হানত। বিষয়টি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ানোয় এফবিসিসিআই, ডিসিসিআইসহ দেশের সব শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এটি প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে আসছিল। ব্যবসায়ীদের সেই দাবির মুখে তাদের বড় স্বস্তি দিতে এবং দেশে ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে আনতে এনবিআর আগামী বাজেটে এই নিয়মে আমূল পরিবর্তন ও ই-টিডিএস (ইলেকট্রনিক উৎসে কর কর্তন) ভিত্তিক আধুনিক ডিজিটাল সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করেছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অগ্রিম কেটে নেওয়া উৎসে কর আর ‘চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় ন্যূনতম কর’ হিসেবে আটকে রাখা হবে না। বছর শেষে করদাতার প্রকৃত আয় বা লভ্যাংশের ওপর ভিত্তি করে যে কর হিসাব করা হবে, তার সঙ্গে এই উৎসে কর পুরোপুরি সমন্বয় করার সুযোগ দেওয়া হবে। কোনো করদাতার অগ্রিম কেটে নেওয়া উৎসে কর যদি বছর শেষের মূল করদায়ের চেয়ে বেশি হয়, তবে সেই অতিরিক্ত অংশটি পরবর্তী করবর্ষের করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। অথবা, করদাতা চাইলে আবেদনের ভিত্তিতে মাত্র ৩ মাসের মধ্যে তা ‘অটোমেটিক রিফান্ড’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন। এই পুরো সমন্বয় ও রিফান্ড প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল অর্থাৎ ই-টিডিএস সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা হবে।
এনবিআর জানিয়েছে, এই ডিজিটাল সংস্কারের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে দেশের রপ্তানিমুখী খাত, কাঁচামাল আমদানিকারক, সরকারি-বেসরকারি বড় সরবরাহকারী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।