প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

এসি যানবাহনে ভয়ংকর বিষ ‘কার্বন মনোক্সাইড’

editor
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬, ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
এসি যানবাহনে ভয়ংকর বিষ ‘কার্বন মনোক্সাইড’

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

ভ্যাপসা গরম আর মহাসড়কের চিরচেনা যানজট এড়াতে সাধারণ মানুষ স্বস্তির আশায় বেছে নিচ্ছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) দূরপাল্লার বাস কিংবা প্রাইভেট কার। কিন্তু এই আপাত আরামদায়ক বাহনগুলোই অসচেতনতায় একেকটি জ্যান্ত ‘গ্যাস চেম্বার’ বা মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। লকড বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ গাড়ির এসি বিকল হয়ে পড়ার কারণে নির্গত হচ্ছে ‘অদৃশ্য বিষ’ কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড। ফুসফুস স্তব্ধ করে দেওয়া এই বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়ে দেশ-বিদেশে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক মানুষ।

 

Manual4 Ad Code

চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বদ্ধ গাড়ির ভেতরে তৈরি হওয়া এই গ্যাস রক্তের হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে চালক বা যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবশ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

 

সম্প্রতি ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহ যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেট কারের ভেতরে এসি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে ওমানপ্রবাসী চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতেও। গত বছরের ১১ আগস্ট রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের বেজমেন্টে পার্ক করা একটি প্রাইভেট কার থেকে জাকির হোসেন ও মিজানুর রহমান নামের দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গাড়ির নষ্ট হয়ে যাওয়া এসি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শরীরে প্রবেশ করে তাদের মৃত্যু ঘটে।

 

চরম বিপদ ডেকে আনছে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড

ডিজেলচালিত বিআরটি বাসের ভেতরে থাকা বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস যাত্রীদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপদ ডেকে আনছে এবং বাসের পেছনের আসনের যাত্রীরা এই ধোঁয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন।

 

কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার প্রধান বিআরটি সিস্টেম ‘ট্রান্সমিলেনিও’র ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা ‘মডেলিং আর্থ সিস্টেমস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (২০২৩) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দল কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স (সিএফডি) ও মন্টে কার্লো সিমুলেশন মডেল ব্যবহার করে দেখিয়েছে, জ্যামে বা স্টেশনে স্টার্ট চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকার সময় বাসের ভেতরে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা সর্বোচ্চ ৯৫ পিপিএম (বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর পদার্থ, গ্যাস বা কণার উপস্থিতি) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গতি যখন ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার থাকে, তখন ভেতরে ঠিকমতো বাতাস চলাচল না করায় এই বিষাক্ত গ্যাস ভেতরেই আটকে থাকে এবং ‘সেলফ-পলিউশন’ তৈরি করে। বাসের ডানদিকের নিচে সাইলেন্সার পাইপ থাকার কারণে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া বাসের পেছনে ও ডানপাশে বেশি জমা হয় এবং কম গতিতে চলার সময় পেছনের ৫ নম্বর আসনে এই দূষণের হার ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেখানে সামনের আসনে এই হার শূন্য শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাত দিয়ে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, কার্বন মনোক্সাইড মানবদেহে ঢুকলে হৃদরোগীদের বুকে ব্যথা, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মানসিক বিভ্রান্তি ও বমি বমি ভাব তৈরি করতে পারে, এমনকি অতিরিক্ত গ্যাসে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, বর্তমান ডিজেলচালিত বাসগুলোকে পুরোপুরি তুলে দিয়ে গ্যাস বা বৈদ্যুতিক বাসে রূপান্তর করা গেলে বাসের ভেতরে এই দূষণের হার শূন্যে নেমে আসবে এবং গণপরিবহন ব্যবহারকারী লাখ লাখ যাত্রীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে আসবে।

 

যানবাহন ও গ্যারেজের আবদ্ধ পরিবেশে কার্বন মনোক্সাইডের এই ভয়াবহ বিপদের সত্যতা মিলেছে ভারতের নয়াদিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসা গবেষণাতেও। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে কার্বন মনোক্সাইডকে ‘অদৃশ্য বিষ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে একটি অটোমোবাইল গ্যারেজে কর্মরত অবস্থায় এক মেকানিক অচেতন হয়ে হাসপাতালের ভর্তির এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। ময়নাতদন্তে মৃতের শরীরে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে চামড়ার নিচের কলা, বুক ও পেটের পেশি চেরি লাল বর্ণ ধারণ করা এবং ফুসফুসে তীব্র ফোলা ভাব দেখা গেছে।

Manual1 Ad Code

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, কার্বন মনোক্সাইড অত্যন্ত দ্রুত রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে মিশে ‘কার্বক্সিহিমোগ্লোবিন’ গঠন করে এবং অক্সিজেনের তুলনায় এর যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা প্রায় ২১০ গুণ বেশি হওয়ায় রক্তে অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে দ্রুত মৃত্যু ঘটে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, গ্যারেজের দরজা খোলা থাকলেও কিংবা গাড়ির নিষ্কাশনব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত হলেও মেঝের ছিদ্র বা রবার নষ্ট হয়ে ক্ষতিকারক ধোঁয়া যাত্রীবাহী বগিতে প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ গৃহস্থালি হিটিং অ্যাপ্লায়েন্স, প্রোপেনচালিত ফর্কলিফট এবং পেইন্ট রিমুভারে ব্যবহৃত ‘মিথিলিন ক্লোরাইড’ বাষ্পের কারণেও এই বিষক্রিয়া হতে পারে।

Manual7 Ad Code

ক্যালিফোর্নিয়ায় হওয়া এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গাড়ির ধোঁয়াজনিত বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়ার বড় অংশই ঘটেছে গ্যারেজের ভেতরে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালু রাখা (৪২ শতাংশ) বা মেরামতের জন্য স্টার্ট দিয়ে রাখার (২৫ শতাংশ) কারণে।

মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে গ্যারেজে বা আবদ্ধ কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হিটিং পণ্যের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্বন মনোক্সাইডের বিপদ সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন।

 

দূরপাল্লার বাসে ঝুঁকি থাকছে: বিশেষজ্ঞ অভিমত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এন এম হামিদুল কবির বলেন, দূরপাল্লার এসি বাসের ক্ষেত্রে কার্বন মনোক্সাইড নিঃসরণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

তিনি বলেন, ‘যদি কোনো এসি বাসের দরজা বা জানালা সম্পূর্ণ লক হয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় এসি কাজ না করে, তবে ভেতরের যাত্রীদের শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেবে, যা ভেতরে থাকা মানুষের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।’

Manual2 Ad Code

চলন্ত বা যানজটে থাকা অবস্থায় বাসের এসি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে যাত্রীদের অন্য গাড়িতে স্থানান্তরিত করা ছাড়া আর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই বলে মন্তব্য করেন ড. হামিদুল কবির।

তিনি বলেন, বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বাসের এসি নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসের প্রধান দরজা এবং যদি কোনো জানালা খোলার ব্যবস্থা থাকে, তা দ্রুত খুলে দিতে হবে। এতে বাইরের বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। দীর্ঘ যানজটে বাস আটকে থাকলে এবং এসি কাজ না করলে চালক ও সহকারীকে কিছুক্ষণ পর পর বাস থামিয়ে যাত্রীদের নিচে নেমে উন্মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, “বাসাবাড়িতে দীর্ঘদিন এসি বন্ধ রেখে হঠাৎ করে তা চালু করলে অনেক সময় গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। এসির রুমগুলো সাধারণত চারপাশ থেকে পুরোপুরি বন্ধ বা ‘কমপ্যাক্ট’ থাকে, তাই লিকেজ হওয়া গ্যাস রুম থেকে বের হতে পারে না। এর ফলে পরবর্তী সময়ে ফায়ারিং বা অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটার প্রবল আশঙ্কা থাকে।”

গণপরিবহনে বিশেষ করে দূরপাল্লার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের কেবিনে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের প্রবেশ ঠেকাতে উন্নত বিশ্বের আদলে ‘ডিটেক্টর ও অ্যালার্ম সিস্টেম’ চালুর দাবি জানিয়েছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে বাসের ভেতরে চার স্তরের কারিগরি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পরিবহন ব্যবসায়ী এস এম আজিজুল আনসারী ও মো. ইকবাল ভুঁইয়া জানান, এসি বাসে বিষাক্ত গ্যাস প্রতিরোধে মূলত তিনটি কারিগরি পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইঞ্জিনের সাইলেন্সার পাইপের ভেতরে থাকা ‘ক্যাটালিটিক কনভার্টার’। এর ভেতরের মৌচাকসদৃশ গঠন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইডকে কম ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্পে রূপান্তর করে। দ্বিতীয়ত, ‘পজিটিভ ক্র্যাঙ্ককেস ভেন্টিলেশন (পিসিভি) ভালভ’ সিলিন্ডার থেকে লিক হওয়া ক্ষতিকর গ্যাসকে পুনরায় ইঞ্জিনের দহন চেম্বারে পাঠিয়ে নিষ্ক্রিয় করে। তৃতীয় পদ্ধতি হিসেবে সাইলেন্সার পাইপ বাসের শেষ প্রান্ত বা ওপরের দিকে টেনে প্রতিটি জয়েন্ট সম্পূর্ণ সিল করা হয়। এ ছাড়া মেঝের ফাঁকফোকর দিয়ে যাতে ধোঁয়া কেবিনে ঢুকতে না পারে, সে জন্য ফ্লোরে বিশেষ ফোম স্প্রে করা হয়।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বিলাসবহুল এসি বাসের কেবিন ফিল্টারে ‘অ্যাক্টিভেটেড কার্বন’ বা চারকোল স্তর ব্যবহার করা হয়। এই চারকোল অধিশোষণ প্রক্রিয়ায় বাতাসে থাকা কার্বন মনোক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্যাস আটকে ফেলে কেবিনের ভেতরের বাতাস যাত্রীদের জন্য নিরাপদ রাখে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code