জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে। কিন্তু সেই অনুপাতে গড়ে উঠছে না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। জেলা ও গ্রাম থেকে প্রতিদিনই মানুষ ছুটছেন রাজধানী ঢাকায়। অথচ বাড়তি এই জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, সড়ক, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহন নেই।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা) অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, ২০৫০ সালে হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরী। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নাগরিক সেবার ঘাটতিতে প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের শারীরিক ভোগান্তি, নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে পানি নিষ্কাশন, আবাসন, পরিবহন, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণে ঢাকায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন জরুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, দেশে নগর জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই বসবাস করেন ৪ কোটি ৪৪ লাখের বেশি মানুষ। কাজ, শিক্ষা ও উন্নত জীবিকার আশায় মানুষ ঢাকামুখী হওয়ায় আবাসন, পরিবহন, পানীয় জল, পয়োনিষ্কাশন ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে।
জলাধার হারিয়ে বাড়ছে জলাবদ্ধতা
সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে যায়। একসময় রাজধানীতে ৫৬টি খাল থাকলেও এর মধ্যে এখন ২৬টির অস্তিত্ব নেই। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাধার হারিয়ে গেছে।
রাজউক এলাকায় একসময় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পুকুর থাকলেও মধ্য ঢাকায় টিকে আছে মাত্র ২২৫টি। বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলামের গবেষণায়, একটি নগরে অন্তত ১২ শতাংশ জলাধার থাকা প্রয়োজন, ঢাকায় এর পরিমাণ ২ শতাংশেরও কম।
দূষণে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য
বায়ুদূষণ ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা। ইটভাটার ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও রাস্তার ধুলাবালি দূষণের প্রধান উৎস। আইকিউএয়ারের ২০২৬ সালের ১৭ আগস্টে প্রকাশিত সূচকে ঢাকার অবস্থান ছিল বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ১৮তম, বায়ুমান সূচক ছিল ৭৯। ঢাকার আশপাশে প্রায় দুই হাজার ইটভাটা রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত রোগে বছরে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
শব্দদূষণও নগরবাসীর জন্য বড় দুর্ভোগ। ক্যাপসের এক গবেষণায় হাসপাতালের সামনে গড় শব্দের মাত্রা ৮১ দশমিক ৭ ডেসিবেল পাওয়া গেছে। অথচ নীরব এলাকায় শব্দের মান ৫০, আবাসিক এলাকায় ৫৫ এবং বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল নির্ধারিত। পাশাপাশি বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ও সাইনবোর্ডের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নগরীতে দৃশ্যদূষণ বাড়াচ্ছে।
Manual5 Ad Code
ডেঙ্গু, বর্জ্য ও অগ্নিঝুঁকি
অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, জলাবদ্ধতা, জমে থাকা পানি ও বর্জ্য এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। গবেষক ড. আব্দুল কাদের মহিউদ্দিনের ২০২৬ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৯৪ হাজার ৩০০ ছাড়ায় এবং মৃত্যু হয় ৩৮২ জনের। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৮ জনে। নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৬৭৪ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৭১৪ জন। গবেষণায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৪৬৫ টন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭৬৫ টন বা ২৭ শতাংশ সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির বাইরে থেকে যায়।
অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন জরিপে পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার স্থানে রাসায়নিক সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার আবাসিক ভবন বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিরপুরে গুদামে আগুনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়। রাসায়নিক গুদাম সরাতে রাসায়নিকপল্লি গড়ে তোলার উদ্যোগও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
যানজট ও কমছে সবুজ জায়গা
বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ৭ কিলোমিটারে নেমে আসার তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০৩৫ সালে তা ৪ কিলোমিটারে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল। ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা’ প্রতিবেদনে যানজটে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বছরে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা ও ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে। এগুলো পৃথক গবেষণার হিসাব।
Manual1 Ad Code
এদিকে জনসংখ্যা ও ভবন বাড়লেও পার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজ জায়গা কমছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান ও মাহফুজুল ইসলামের গবেষণায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকায় ঘন সবুজের পরিমাণ ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ পাওয়া যায়।
গণপরিবহন ও ফুটপাতও সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক জরিপে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে হয়রানির আশঙ্কা এবং ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কথা জানিয়েছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু ও প্রবীণদের চলাচলের উপযোগী অবকাঠামোরও ঘাটতি রয়েছে।
Manual8 Ad Code
অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, জলাধার ও কৃষিজমি ভরাট এবং দুর্বল উন্নয়ন নগরীর সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ঢাকার চাপ কমাতে উত্তরা ও পূর্বাচলকে স্যাটেলাইট টাউন হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তার অভিযোগ, ব্যবসায়িক স্বার্থে গত চার বছরে তিনবার ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু মেট্রোরেল বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করে ঢাকার যানজট ও বাসযোগ্যতার সংকট দূর করা যাবে না। সরকারি দপ্তর, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি জলাধার ও সবুজ এলাকা পুনরুদ্ধার, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ বন্ধ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
Manual5 Ad Code
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিআইপি সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বসবাসযোগ্যতার সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। এর প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঢাকামুখী মানুষের চাপ। দ্রুতবর্ধনশীল এই নগরীর জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সামগ্রিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, শুধু ঢাকাকে নয়, পুরো বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে গ্রাম, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা বাড়িয়ে বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন শহরের জন্য পরিকল্পনা তৈরি হলেও বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বরং ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে অনেক সময় পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়। এ ক্ষেত্রে পেশাজীবী ও পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।