রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাকে প্রাধান্য দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং অংশীজনদের মতামত নিয়েছে কমিটি।
ইতোমধ্যে ১০টি বৈঠক হলেও গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি কমিটি।
Manual1 Ad Code
সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়টি আলোচনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করেন।
রাষ্ট্রপতির আদেশও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আসে। এতে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত এসেছে। কমিটির আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি রয়েছে। এ দাবি বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার। সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির বৈঠকগুলোতেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকায় কমিটি বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা জানান।
Manual1 Ad Code
কমিটির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তবে এ সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া কেমন হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন মতামত এসেছে। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও অংশীজনদের মতামতে উঠে এসেছে। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষে উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করে তাকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। পরবর্তী সময়ে ওই উপ-রাষ্ট্রপতি বা উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও রয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিধান রাখার বিষয়েও মতামত এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসব প্রস্তাব, পরামর্শ ও মতামত আপাতত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে কোনো প্রস্তাবের বিষয়েই কমিটি এখন পর্যন্ত খসড়া প্রস্তাব তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি। প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে। এগুলো পরবর্তী সময়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রস্তাবগুলোর আইনি দিক বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। এরপর একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে কমিটি।
প্রয়োজন হলে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পুনরায় মতামত ও ব্যাখ্যা নেওয়া হতে পারে। সব প্রস্তাব ও মতামত বিচার-বিশ্লেষণ করে কমিটি একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করবে। এরপর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে সংবিধান সংশোধনের খসড়া সংসদে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হবে।
Manual8 Ad Code
সংবিধান সংশোধনের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের অনেকেই কমিটিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। সেগুলো সামনে রেখেই কমিটি কাজ করবে। আমরা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে, তাদের সেন্টিমেন্টকে ধারণ করে একটি যুগোপযোগী সংবিধান জাতিকে উপহার দিতে চাই। সে লক্ষ্যেই এই কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। যেসব মতামত ও প্রস্তাব এসেছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই কমিটি একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করবে। কাজ চলছে, এতে কিছুটা সময় লাগবে।
Manual1 Ad Code
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ ইতোমধ্যে ১০টি বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। তবে এ কমিটিতে বিরোধী দলের কোনো সদস্য নেই। বিরোধী দলের সদস্যদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেয়নি। অপেক্ষার পর গত ১৩ জুলাই সংসদের অধিবেশনে ১২ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। তবে বিরোধী দল এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আগামী ৯ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। তবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চলবে এ অধিবেশন। সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় এ অধিবেশনে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে না।