আমনের ভরা মৌসুমেও বাড়ছে চালের দাম। এক বছরের ব্যবধানে সরু চালের দাম বেড়েছে ১৪ শতাংশ, মাঝারি ১৭ শতাংশ এবং মোটা ৭ শতাংশ। খুচরা ও পাইকারি চাল বিক্রেতারা বলছেন, মিলাররা বেশি করে ধান গুদামে মজুত করে ইচ্ছামতো বাড়াচ্ছেন চালের দাম। গোডাউনে অভিযান না চালালে কমবে না দাম। মিলাররা বলছেন, হাটবাজারে ফড়িয়ারা (মধ্যস্বত্বভোগী) বেশি করে ধান মজুত করায় বাড়ছে দাম। এ অবস্থায় ভোক্তাদের পকেট খালি হলেও কেউ দায় নিচ্ছে না।
বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
Manual8 Ad Code
গত বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলনের পরও কমেনি চালের দাম। বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার চালের দাম কমাতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে। আগে চালের ওপর আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, অগ্রিম আয়কর এবং আগাম কর মিলে ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ দিতে হতো। দাম কমাতে সরকার গত ২০ অক্টোবর চালের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেয়। তাতেও আমদানিকারকরা তেমন সাড়া দেননি। তাই আমদানি পর্যায়ে সব শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করে এনবিআরকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। তা আমলে নিয়ে চালের দাম সহজলভ্য করতে গত ১ নভেম্বর চাল আমদানিতে শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ বাদ দিয়ে শুধু ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রাখা হয়েছে। এতে চালের আমদানি মূল্য কেজিপ্রতি ৯ টাকা ৬০ পয়সা কমার কথা জানায় এনবিআর। কিন্তু এখনো বেশি দাম পড়ায় ভারত থেকে চাল আনছেন না আমদানিকারকরা।
এ ব্যাপারে বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও রাতুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল লতিফ বলেন, ‘সরকার ভারত থেকে আমদানির সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ডলারের দাম বেশি। এ জন্য কুলিয়ে উঠা যায় না। চাল আমদানি করা যাচ্ছে না।’
Manual3 Ad Code
এদিকে নভেম্বর মাস থেকে আমন ধান উঠতে শুরু করেছে। এরপর থেকে চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, আগের চেয়ে বর্তমানে চালের দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সরু চালের দাম ৬০-৭৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৭০-৮৪ টাকা কেজি হয়েছে, বেড়েছে ১৪ শতাংশ। গত বছরে মাঝারি আকারের আটাশ চাল ৫০-৫৫ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এখন তা ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ৫৮-৬৫ টাকা কেজিতে। বেড়েছে ১৭ শতাংশ। আমনের ভরা মৌসুমেও ৪৮-৫০ টাকার মোটা চাল এখন ভোক্তাদের ৫০-৫৫ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে।
Manual4 Ad Code
বিভিন্ন বাজারের খুচরা চাল বিক্রেতারাও বলছেন, কিছুতেই কমছে না চালের দাম। জানতে চাইলে মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের পারভেজ রাইস এজেন্সির পারভেজ হাসান বলেন, ‘আমদানি করা চাল কম আসছে। কারণ ভারতে চালের দাম বেশি। বেনাপোল বন্দরেই ৫৩ টাকা কেজি। ভাড়া দিয়ে আনার পর ৫৫ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের মোটা স্বর্ণা চালের দাম এর চেয়ে কম ৫২ টাকা কেজি। মিনিকেট ও আটাশ চালের দামও বেশি।’
Manual6 Ad Code
এদিকে কারওয়ান বাজারের খুচরা চাল বিক্রেতা আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী এম এ আওয়াল তালুকদার বলেন, ‘বড় বড় মিলার এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠান বেশি করে ধান মজুত করছে। বিড়ি, সয়াবিন তেলের ব্যবসায়ীরাও চালের ব্যবসায়ে জড়িয়েছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বাজার থেকে ধান উধাও হয়ে যাচ্ছে। তখন মিলমালিকরা সিন্ডিকেট করে সুযোগ বুঝে বাড়াচ্ছে চালের দাম। মিলে অভিযান চালালেও এই খবরের সত্যতা মিলবে।’
পাইকারি ও খুচরা চাল বিক্রেতাদের অভিযোগের ব্যাপারে দিনাজপুর জেলা সদরের আদর অ্যান্ড মমতা অটো রাইস মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শহিদুর রহমান পাটোয়ারি মোহন বলেন, ‘উৎপাদন খরচ না বাড়লেও কমবে না চালের দাম। কারণ ফড়িয়ারা লাইসেন্স ছাড়াই হাটবাজারে ধান, গম, সরিষা কিনে মজুত করছে। সুযোগ বুঝে বেশি দামে বিক্রি করছে। এ জন্য আমাদের বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে।’
সরকার পদক্ষেপ নিলে কি চালের দাম কমবে? এমন প্রশ্নের জবাবে এই মিলমালিক বলেন, ‘বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও লাইসেন্স ছাড়া ধান, গম সরিষা কিনে মজুত করছে। এ জন্য অল্প সময়ে বাজার থেকে এসব পণ্য উধাও হয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে। আমরা ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশে ঋণ নিলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়ে গেছে। এ জন্য একই পুঁজি ব্যবহার করলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে হাটবাজারে প্রশাসনকে অভিযান চালাতে হবে। তা না হলে কমবে না চালের দাম।’