দেশে বায়ুদূষণে প্রতিবছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ২৫৮ জন শিশু রয়েছে, যা মৃত্যুর ৫ শতাংশ। একই কারণে প্রতিবছর ৯ লাখ ৪৮৫ মায়ের অকাল প্রসব হচ্ছে ও জন্ম নিচ্ছে প্রায় সাত লাখ কম ওজনের শিশু।
এমনকি বায়ুদূষণজনিত অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে সেবা নিচ্ছে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮২ জন। এই দূষণে পড়ে বছরে ২৬ কোটি ৩০ লাখ কর্মদিবস হারাচ্ছে দেশের মানুষ।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্মকণা বায়ুদূষণে জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শীর্ষক এক নতুন গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে হার্ট ডিজিস, স্ট্রোক, হাঁপানি-শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুস ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশের তালিকায় স্থান হয়েছে বাংলাদেশের। যেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বালুকণার বার্ষিক মান ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম; যা বার্ষিক জাতীয় মানদণ্ড ৩৫ মাইক্রোগ্রামের দ্বিগুণের বেশি। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড ৫ মাইক্রোগ্রামের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি।
Manual3 Ad Code
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অধিকমাত্রায় দূষণের কারণে দেশে উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা কমছে। ২০১৯ সালে সার্বিকভাবে এই ব্যয়গুলো ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল, যা বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ।
বাতাসের এমন চরম দূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপর অনিবার্য পরিণতি ডেকে আনছে। বিভিন্ন বয়সীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি পাঁচ বছর কম বয়সী শিশুদের ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
Manual7 Ad Code
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় বায়ুমানের মানদণ্ড (৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার) পূরণ করা সম্ভব হলেও, তা বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে মৃত্যুহার ১৯ শতাংশ, আয়ুষ্কালজনিত সমস্যা ২১ শতাংশ এবং অক্ষমতার সঙ্গে বসবাস করা বছর ১২ শতাংশ কমতে পারে। এ ছাড়া ডব্লিউএইচওর ২০২১ সালের কঠোর নির্দেশিকা বায়ুর মান প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম অর্জন করা সম্ভব হলে মৃত্যুহার ৭৯ শতাংশ কমবে। এতে প্রতিবছর ৮১ হাজার ২৮২ মানুষের জীবন রক্ষা হবে। সেই সঙ্গে হাঁপানি-শ্বাসকষ্টসহ বায়ুদূষণজনিত রোগের চিকিৎসায় জরুরি চিকিৎসক ভিজিট, অকাল প্রসব এবং অসুস্থতাজনিত ছুটি এড়ানো যাবে।
Manual4 Ad Code
গবেষণায় বায়ুদূষণরোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশকে নিজস্ব জাতীয় নির্দেশিকা মেনে চলার পাশাপাশি মাঝারি মেয়াদে ২০০৫ সালে ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০ মাইক্রোগ্রামের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০২১ সালের ডব্লিউএইচও নির্দেশিকা প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম অর্জন করা উচিত। কয়লা ও ডিজেলের মতো কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিত করা উচিত।
অনুষ্ঠানে সিআরইএর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশ্লেষক এবং প্রধান লেখক ড্যানিয়েল নেসান বলেন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি গ্রহণের মাধ্যমে বায়ুদূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সিআরইএর বায়ুমান বিশ্লেষক ড. জেমি কেলি বলেন, বাংলাদেশের বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান জনস্বাস্থ্য এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সমতুল্য।
Manual1 Ad Code
ক্যাপস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে গিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা শুধু মানুষের শরীরেই প্রভাব ফেলছে না, বরং বিপর্যস্ত করে তুলছে মানসিক স্বাস্থ্যকেও। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স-২০২৪ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর মানুষের গড় আয়ু ২ দশমিক ৭ বছর হ্রাস পেয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে নাগরিকদের গড় আয়ু হ্রাস পেয়েছে ৪ দশমিক ৮ বছর।