দেশে সুষম উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের তথ্যমতে, আগামী তিন অর্থবছরের জন্য এই খাতে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার ১০১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনা। এ ছাড়া টেকসই রাষ্ট্র গঠন এবং অঞ্চলভিত্তিক সমতা নিশ্চিত করতে এই বিশাল বরাদ্দ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের একটি সমন্বিত পথ প্রশস্ত হবে।
Manual8 Ad Code
পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকিল আকতারের মতে, সরকারের মূল দর্শন হলো বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা অর্জন করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এডিপির আওতায় খাতটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রামীণ সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পুঁজি সুবিধা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। নাগরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যকার ব্যবধান অনেকটাই কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই দর্শন বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর মনিটরিং বজায় রাখতে হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বিদ্যমান প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও ক্ষুদ্র অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ পণ্য বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করতেও নেওয়া হয়েছে একাধিক কার্যকর পরিকল্পনা। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মানোন্নয়নেও বিশেষ পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সেবা আরও ত্বরান্বিত হবে।
বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ১৪ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। পরবর্তী ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য ১৫ হাজার ৯২২ কোটি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ১৭ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ১১ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা এবং পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে প্রায় ৪৯৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় পল্লী প্রতিষ্ঠানে ৯৩৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
Manual4 Ad Code
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে স্থানীয় পর্যায়ের সুশাসন ও সম্পদ আহরণ জোরদার করা হচ্ছে। নারীর অর্থনৈতিক বিকাশ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে পল্লী উন্নয়ন খাতে বিশেষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ভূমি অধিকার ও পুষ্টির বিষয়েও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সমবায়ের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। সমন্বিত গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে এই লক্ষ্যগুলো সামনের দিনে ভূমিকা রাখবে। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
চলতি অর্থবছরের কার্যক্রমে গ্রাম ও শহরের সংযোগ স্থাপনে সড়ক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অভিগম্যতা সূচক ৪ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এ ছাড়া স্থানীয় হাটবাজার ও কমপ্লেক্স ভবনের সংস্কার কাজের মাধ্যমে অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ভূমিহীন পরিবারের পুনর্বাসনে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন গ্রামীণ জনগণের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে।
Manual5 Ad Code
Manual8 Ad Code
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে সংস্কার ও মেরামত কাজ চলমান রয়েছে। অবশিষ্ট সব ইউনিয়ন পরিষদে কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। সমবায় খাতকে নতুন করে প্রাণসঞ্চারের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য সমন্বিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এই কাজের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা বজায় রাখা সরকারের বড় লক্ষ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এখানকার মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা হচ্ছে। কৃষি ও অকৃষি উভয় ক্ষেত্রেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া হবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা কৃষকদের নতুন স্বপ্ন দেখাবে। এসব উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায়Ñ তা নিশ্চিত করা হবে।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত উন্নয়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিরাপত্তার কাজ করা হচ্ছে। গ্রামীণ সড়কগুলোর দুই লেন বৃদ্ধি ও মানোন্নয়নে কাজ চলমান রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম সড়ক তৈরির চেষ্টা চলছে। এই সড়কগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। মানসম্পন্ন কাজের মাধ্যমে প্রকল্পের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে।